অপরিকল্পিত বালি উত্তোলনে
ভয়ঙ্কর রূপ নিচ্ছে নদী ভাঙনবর্ষা মৌসুমের শুরুতেই নদী সংলগ্ন এলাকায় ভাঙনে বিলীন হচ্ছে বাড়িঘরসহ হাজার হাজার হেক্টর ফসলী জমিকিশোর সরকার
কোনো প্রকার জরিপ ছাড়া নদীগর্ভ থেকে অপরিকল্পিতভাবে বালিমাটি উত্তোলনের কারণে দেশের নদীসংলগ্ন এলাকাগুলো ভয়াবহ ভাঙনের কবলে পড়েছে। সম্প্রতি নদী বিশেষজ্ঞরা এ অভিমত দিয়েছেন। কারণ বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই প্রতি বছরের মতো এবারো দেশের ছোট বড় প্রায় সব নদীসংলগ্ন এলাকায় মারত্মক ভাঙন শুরু হয়েছে। বিলীন হয়ে যাচ্ছে অসংখ্য বাড়িঘর, হাটবাজারসহ হাজার হাজার হেক্টর ফসলি জমি।
সেন্ট্রাল এনভায়রনমেন্টাল জিওগ্রাফিক্যাল ইনফরমেশন সার্ভিসের (সিইজিআইএস) গবেষণা মতে, গত ৪০ বছরে বন্যা ছাড়া পদ্মা, যমুনা ও মেঘনা নদীতে আগের চেয়ে ভাঙন কমেছে। তবে আগে নদীতে পানির স্রোত যত ছিল এখন তা নেই। এছাড়া নদীর ওপর ব্রিজ-কালভার্ট ও বাঁধ নির্মাণ করায় ছোট-বড় সব নদী ভরাট হয়ে গেছে। সে কারণেও নদী ভাঙন কিছুটা কমেছে। কিন্তু বড় নদীগুলোর ভাঙন কমলেও বর্ষা মৌসুমে ছোট নদীগুলোতে বেড়েছে ভাঙনের তীব্রতা।
এ ব্যাপারে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাইড্রোগ্রাফি বিভাগের কোনো রকম জরিপ ছাড়া দেশি প্রযুক্তিতে তৈরি 'বোরিং সাকসেশন মেশিন'র মাধ্যমে নদী থেকে অপরিকল্পিতভাবে বালিমাটি উত্তোলন করায় নদী ভাঙন বাড়ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, 'বোরিং সাকসেশন মেশিন' নদীতে এক জায়গায় ২০ থেকে ৩০ ফুট পর্যন্ত গর্ত করে বালি উত্তোলন করা হয়। এতে বড় নদীর ওপর তেমন কোনো প্রভাব না পড়লেও ছোট নদীগুলো হয়ে পড়ছে ভয়ানক। বিশেষ করে এ বর্ষায় ঢাকার পার্শ্ববর্তী তুরাগ, বালু, শীতলক্ষ্যাসহ ছোট ছোট নদীর তীর ভাঙছে প্রবলভাবে। ভাঙনের তোড়ে অনেকের বসতবাড়ি বিলীন হয়ে যাচ্ছে। এছাড়া অপরিকল্পিত বালি উত্তোলনের ফলে নদীর গতিপথও পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে দ্রুত।
জানা যায়, হাইড্রোগ্রাফি বিভাগের জরিপ চার্ট ছাড়াই যমুনা সেতু কাছ থেকে বালিমাটি উত্তোলন করায় এ সেতুটিও হুমকির মুখে পড়েছিল। এ বিষয়ে পত্র-পত্রিকায় খবর প্রকাশিত হলে যমুনা নদীর ওই স্থান থেকে বালিমাটি উত্তোলন বন্ধ করা হয়।
সিইজিআইএস'র হিসাব অনুযায়ী ২০১০ সালে পদ্মা নদীর উজানে ২৬৩ হেক্টর এবং ২০১১ সালে ভাঙে ৯৩২ হেক্টর তীরভূমি। ২০১০ সালে পদ্মার নিম্নাঞ্চল ৪৭৭ হেক্টর, ২০১১ সালে ৬৪৬ হেক্টর তীরভূমি ভাঙে।
তবে উজান থেকে পানি কম আসায় এবং যমুনা সেতু নির্মাণ হওয়ার কারণে ২০১০ সালে ২ হাজার ৩০৭ হেক্টর ভাঙলেও ২০১১ সালে তা কমে ভাঙে ২ হাজার হেক্টর তীরভূমি।
সিইজিআইএস'র উপ-নির্বাহী পরিচালক ড. মমিনুল হক যায়যায়দিনকে বলেন, সরকারের একার পক্ষে নদীর পলিমাটি অপসারণ করা সম্ভব নয়। সেক্ষেত্রে বেসরকারিভাবে কোনো প্রতিষ্ঠান যদি নিজেদের প্রয়োজনে নদী থেকে বালিমাটি নিতে চায় তাতে সমস্যা হওয়ার কথা না। কিন্তু কোনো নদীর কোনো স্থান থেকে কতটুকু বালিমাটি কাটা যাবে হাইড্রোগ্রাফি বিভাগ থেকে সে ব্যাপারে একটা জরিপ হওয়া দরকার। এর পর ওই জরিপ চার্ট অনুযায়ী নদী থেকে বালিমাটি উত্তোলনের অনুমতি দেয়া উচিত। কেননা, নিজেদের ব্যবসায়িক স্বার্থে নদী থেকে যত্রতত্র বালিমাটি উত্তোলনের ফলে নদীর ভাঙন তো বাড়ছেই। তাছাড়া নদীর গতিপথও পরিবর্তন হচ্ছে দিন দিন।
জানা যায়, বালুমহল ও মাটি ব্যবস্থাপনা বিধিমালা ২০১০ অনুযায়ী নৌ-বন্দরের সীমানার বাইরে নির্ধারিত নৌ-পথগুলো থেকে বালু উত্তোলনের জন্য বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডবিস্নউটিএ) হাইড্রোগ্রাফি বিভাগ থেকে জরিপ চার্ট তৈরি করে নিতে হয়। এছাড়া বিধিমালা অনুযায়ী হাইড্রোগ্রাফি বিভাগের চার্ট অনুযায়ী নদীর ঢাল সংরক্ষণ করে বালিমাটি উত্তোলনের কথাও বলা হয়েছে। কিন্তু দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি 'বোরিং সাকসেশন মেশিন' দিয়ে নদী থেকে বালিমাটি উত্তোলনের ক্ষেত্রে তা মানার কোনো সুযোগ নেই। এছাড়া বালিমাটি ইজারা প্রদান ও আনুষঙ্গিক বিষয় বিধিমালা ২০১০ অনুযায়ী পাম্প ড্রেজিং ব্যবহার করে নদী থেকে বালিমাটি উত্তোলন করা যাবে না বলে উল্লেখ করা থাকলেও জেলা প্রসাশকের অনুমতি নিয়ে 'বোরিং সাকসেশন' দিয়ে পাম্প করে বালিমাটি উত্তোলন করে যাচ্ছে ব্যবসায়ীরা। এতে নদীর তলদেশে গভীর গর্তের সৃষ্টি হচ্ছে।
সাধারণত বিআইডবিস্নউটিএ'র ড্রেজিং বিভাগ নদীর ঢাল ঠিক রেখে কাটার ড্রেজারের মাধ্যমে নদীর ড্রেজিং করে। এতে নদীর ভাঙন বা গতিপথ পরিবর্তন হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না বলে বিআইডবিস্নউটএ'র ড্রেজিং বিভাগের প্রধান প্রকৌশলী হাসান মাহমুদ তারিক জানান। তিনি বলেন, দেশে এক সময় ২৪৫টি নদ-নদী ছিল। কিন্তু বর্তমানে এর মধ্যে মাত্র পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা ছাড়া কোনো নদী দিয়ে বড় নৌযান চলাচল করতে পারে না।
অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ ছাড়াও 'বোরিং সাকসেশন মেশিন'র মাধ্যমে নদী খননের কারণেও নদীগুলোর এ বেহাল দশা বলে স্বীকার করেন হাসান মাহমুদ।
জানা গেছে, নদীর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব বিআইডবিস্নটিএ'র নৌসংরক্ষণ ও পরিচালন (সিএনপি) বিভাগ। আর ওই সিএনপি বিভাগ নৌ-পথ রক্ষার জন্য কোনো স্থান থেকে কতটুকু বালিমাটি কাটতে হবে তা নির্ধারণের জন্য হাইড্রোগ্রাফি বিভাগকে দায়িত্ব দেয়। আর হাইড্রোগ্রাফি বিভাগের চার্ট অনুযায়ী বিআইডবিস্নটিএ'র ড্রেজিং বিভাগ পরিমাণ মতো বালিমাটি কেটে দেয়। নদীর ঢাল রক্ষা করে এ ড্রেজিং করা হয়। কিন্তু নদীর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব বিআইডবিস্নউটিএ পালন করলেও ব্যবসায়িক ভিত্তিতে নদী থেকে বালিমাটি উত্তোলনের অনুমতি দেন মূলত জেলা প্রসাশক। এর ক্ষেত্রে যে সব ব্যবসায়ীরা নদী থেকে বালিমাটি উত্তোলনের ইজারা নেন তারা বালিমাটি উত্তোলনের নীতিমালা মানছে কিনা তা দেখার কেউ নেই।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বিআইডবিস্নটিএ'র চেয়ারম্যান ড মো. শামছুদ্দোহা খন্দকার যায়ায়দিনকে বলেন, নদী ভাঙন বন্ধ এবং নদীর গতিপথ ঠিক রাখতে হলে হাইড্রোগ্রাফি বিভাগের মাধ্যমে জরিপ করে চার্ট তৈরি নাদী থেকে বালিমাটি উত্তোলনের অনুমতি দেয়া উচিত। তা না হলে ভবিষ্যতে নদী রক্ষ করা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। এছাড়া তিনি বলেন, নদী রক্ষা করবে বিআইডবিস্নউটিএ আর নদী থেকে মাটি উত্তোলনের অনুমতি বা ইজারা দেবেন জেলা প্রশাসক এমন হওয়া উচিত নয় বলেও দাবি করেন তিনি।