সিরিয়া দখলে নীলনকশা সিআইএরযাযাদি ডেস্ক
সিরিয়ায় নাশকতা চালিয়ে প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের সরকারকে উৎখাত করতে সিআইএর গুপ্তবাহিনী তুরস্কের বুকে সক্রিয় রয়েছে বলে আমেরিকান সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে আলোড়ন উঠেছে। আমেরিকান প্রশাসন অস্বীকার করলেও কীভাবে অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যাকে ব্যবহার করে সাম্রাজ্যবাদ তার থাবা প্রসারিত করে, এ হলো তারই সাম্প্রতিক নজির।
সম্প্রতি নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে প্রবীণ আমেরিকান ও আরব দুনিয়ার গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, সিআইএর এজেন্টরা স্বয়ংক্রিয় রাইফেল, রকেটচালিত গ্রেনেড, সমরাস্ত্র ও ট্যাঙ্ক প্রতিরোধী অস্ত্রশস্ত্র পর্যন্ত চোরাচালান করছে তুরস্কের সীমানা দিয়ে। অস্ত্রপাচারের কাজে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় থাকা লোকজন; এমনকি সিরিয়ার মুসলিম ব্রাদারহুডের সদস্যদেরও ব্যবহার করা হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে। অস্ত্র জোগাড়ে অর্থ দিচ্ছে কাতার, সৌদি আরব ও তুরস্কের মতো আমেরিকা সখ্য দেশসমূহ।
প্রসঙ্গত, যদিও এই প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়ার একদিন আগেই ওবামা প্রশাসনের পরারাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ভিক্টোরিয়া ন্যুল্যান্ড আমেরিকার ঘোষিত নীতি পুনরায় উল্লেখ করে বলেছেন, 'আমরা বারবার বলেছি, সিরিয়ায় বিদ্রোহীদের কাছে অস্ত্র পাচারের ঘটনায় আমরা যুক্ত নই।' একইসঙ্গে জাতিসংঘে নিযুক্ত সিরিয়ার রাষ্ট্রদূত বাশার আল-জাফরি প্রধান বিদেশি শক্তিসমূহের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানিয়ে বলেছেন, 'তারা সিরিয়ায় সশস্ত্র সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীসমূহকে মদদ দিচ্ছে, যাতে সঙ্কট গভীরতর হয়ে এক 'বিস্ফোরণের চেহারা নেয়।' প্রকাশিত প্রতিবেদনের মাধ্যমে যেমন আগের সংবাদসমূহের সত্যতা প্রমাণ হলো তাই-ই নয়, আরো বিস্তৃতভাবে এই আমেরিকান অভিযানের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এই গোপন ষড়যন্ত্রের মূল লক্ষ্য হলো, সিরিয়ার বুকে গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতি সৃষ্টি করে বর্তমান শাসক গোষ্ঠীকে উৎখাত করা।
একইভাবে, গত মাসে ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল, বিদ্রোহীরা 'সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে বিশেষ উন্নত প্রযুক্তির অস্ত্র সরবরাহ পাচ্ছে, যা পারস্যের আরব দেশসমূহের আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা ও আমেরিকার যোগসাজশে সম্ভব হচ্ছে'। ১৬ মে প্রকাশিত প্রতিবেদনে আমেরিকান যোগসাজশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কার্যকলাপ উল্লেখ করে বলা হয়েছে, 'বিরোধী শক্তির সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তুলে আরব দেশসমূহকে বিদ্রোহীদের বিশ্বাসযোগ্যতা ও তাদের মধ্যে নিয়ন্ত্রণকারী পরিকাঠামো গড়ে তোলার পরামর্শ দিচ্ছে'। একই অভিযোগ তুলে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে বলা হয়েছে, 'সিআইএ এবং আমেরিকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যৌথভাবে সৌদি আরব, তুরস্ক, কাতার ও অন্যান্য মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে একযোগে বিরোধী ফ্রি সিরিয়ান আর্মি গোষ্ঠীকে সহায়তা দিচ্ছে, যাতে অস্ত্র সরবরাহের পথ মসৃণ হয় সিরিয়ার বুকে এবং তাদের উন্নত যোগাযোগ প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে।' এই গোপন অভিযানের ফলে সিরিয়ার বুকে সশস্ত্র হিংসাত্মক ঘটনার পরিমাণ মারাত্মক বৃদ্ধি পেয়েছে এবং সঙ্গে সঙ্গে সিরিয়ার সামরিক বাহিনীর সদস্যদের মৃত্যুর ঘটনা এবং আহত হওয়ার ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে।
জার্মানির সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে, অন্তত তিন হাজার সেনা লিবিয়া থেকে সিরিয়ায় অনুপ্রবেশ করেছে তুরস্কের মধ্য দিয়ে। এছাড়া??ও একইরকম বাহিনী ইরাক থেকে সিরিয়ায় অনুপ্রবেশ করছে, যাতে আমেরিকার দখলে থাকা ইরাকে যেভাবে শিয়া ও সুনি্ন সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে রক্তাক্ত হানাহানির ঘটনা ঘটেছিল, তার পুনরাবৃত্তি ঘটানো সম্ভব হয় সিরিয়ার বুকে।
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে একজন পরিচয় গোপনকারী প্রবীণ আমেরিকান কর্মকর্তার বক্তব্য উদ্ধৃত হয়েছে; যিনি সিরিয়া তুরস্ক সীমানায় সিআইএর পক্ষে কর্মরত। তিনি বলেন, 'আমরা সাহায্য করছি, যাতে শুধুমাত্র অস্ত্রশস্ত্র আল-কায়েদা বা অন্য সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীর হাতে চলে না যায়।' যদিও এ ধরনের দাবি অযৌক্তিক। কারণ সিরিয়া সীমান্তে আমেরিকান নজরদারির ঘটনার সঙ্গে মিল রয়েছে ১৯৮০-র দশকে পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্তে আমেরিকান অভিযানের সঙ্গে। যখন সৌদি আরব বেশিরভাগ আর্থিক রসদের যোগান দিয়েছিল এবং আল-কায়েদা জঙ্গি গোষ্ঠীর জন্ম হয়েছিল আমেরিকান নীতির মিত্র ও হাতিয়ার হিসেবে। একইভাবে দামেস্কে ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটানোর লক্ষ্যে সিরিয়ার বুকে সক্রিয় মুসলিম মৌলবাদী গোষ্ঠী ও সংলগ্ন আরব দেশসমূহের সন্ত্রাসবাদের সমর্থক প্রশাসন হলো তাদের কৌশলের হাতিয়ার। জানা গেছে, তিউনিসিয়ার জিহাদিরা সিরিয়ায় অনুপ্রবেশ করেছে। মুসলিম মৌলবাদীরা যুব সম্প্রদায়কে উত্তেজিত করছে, যাতে সিরিয়ার বর্তমান 'অবিশ্বাসী' রাজত্বকে ধ্বংস করা সম্ভব হয়।