অাঁধারে খালাফ হত্যা মামলাতদন্ত কর্মকর্তা বললেন 'মামলাটি ক্লুলেস'তানভীর হাসান
হত্যাকা-ের চার মাস পেরিয়ে গেলেও শনাক্ত হয়নি সৌদি দূতাবাসের দ্বিতীয় সচিব (হেড অব সৌদি সিটিজেনস অ্যাফেয়ার্স) খালাফ আল-আলীর খুনিরা। উদ্ঘাটন করা যায়নি হত্যার সঠিক কোনো কারণ। এমনকি সন্দেহভাজন কাউকে এ মামলায় আটকও করতে পারেনি গোয়েন্দা পুলিশ। এ অবস্থায় ১৩ মে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন করে দায়িত্ব দেয়া হয় ডিবির সিনিয়র এসি ওবায়েদ রহমানকে। নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানান, এটি 'ক্লু'লেস একটি হত্যাকা-। হত্যাকা-ের পর থেকে এখন পর্যন্ত আসামি শনাক্ত ও হত্যাকা-ের সম্ভাব্য কারণও জানা যায়নি। এ অবস্থায় আদৌ এ মামলার আসামি গ্রেপ্তার হবে কি না তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।
ওদিকে ৩০ জুন সৌদি দূতাবাসের রাষ্ট্রদূত ও উপ-রাষ্ট্রদূতকে হত্যার হুমকি দেয়ার দায়ে আ ন ম আব্দুর রশীদ (৪৫) নামে সাবেক এক সৌদি দূতাবাস কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। খালাফ হত্যার সঙ্গে তার কোনো যোগসূত্র রয়েছে কিনা খতিয়ে দেখতে তাকে কয়েক দফা রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। কিন্তু তার কাছ থেকেও খালাফ হত্যা সংশ্লিষ্ট কোনো কিছু পাওয়া যায়নি। তাকে চাকরিচ্যুত করার কারণে তিনি মোবাইল ফোনে হুমকি দেন বলে তদন্ত কর্মকর্তাদের জানান।
৫ মার্চ সোমবার রাতে গুলশানের ১২০ নাম্বার রোডে বাসার অদূরে সৌদি দূতাবাসের দ্বিতীয় সচিব (হেড অব সৌদি সিটিজেনস অ্যাফেয়ার্স) খালাফ আল-আলীকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পাওয়া যায়। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ভোর সাড় ৫টার দিকে গুলশানের ইউনাইটেড হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় ৭ মার্চ গুলশান থানার এসআই মোশারফ হোসেন বাদী হয়ে অজ্ঞাত সন্ত্রাসীদের নামে হত্যা মামলা করেন। পরবর্তীতে ১৪ মার্চ মামলাটি ডিবিতে হস্তান্তর করা হয়।
এ বিষয়ে খালাফ হত্যা মামলার তদারকি কর্মকর্তা ডিবির এডিসি সোলাইমান হোসেন যায়যায়দিনকে জানান, এ হত্যা মামলা একটি ক্লুলেস হত্যা মামলা। এ খুনের সঙ্গে এখনো পর্যন্ত কারো কোনো যোগসূত্র পাওয়া যায়নি। মামলার তদন্ত কাজ চলছে। খুনি গ্রেপ্তার ও রহস্য উদ্ঘাটন না করা পর্যন্ত মামলার তদন্ত কাজ অব্যাহত থাকবে।
তিনি জানান, ঘটনার পর থেকে তিনটি কারণকে সামনে রেখে তদন্ত শুরু করা হয়। এর মধ্যে- ব্যক্তিগত অথবা পেশাগত কারণ, ছিনতাইকারীদের হাতে খুন হতে পারেন কিনা? সর্বশেষ আন্তজার্তিক কোনো মহল সৌদি সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের অবনতি ঘটানোর জন্য তাকে পরিকল্পিতভাবে খুন করা হয় কিনা? প্রতিটি কারণের শেষ পর্যায়ে এসে হিসাব মেলানো যাচ্ছে না।
মামলার ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে তিনি আরো বলেন, খুনি অনেক চতুর। কোনো ধরনের আলামত রেখে যায়নি। যেসব আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে তা থেকে খুনি শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
মামলার সার্বিক তদন্ত প্রশ্নে তিনি বলেন, পেশা ও ব্যক্তিগত কারণকে সামনে রেখে তদন্ত করতে গিয়ে খালাফ যে বাসায় বসবাস করতেন সেখানকার তৃতীয় তলার এক আদম ব্যবসায়ীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তার কাছ থেকেও কোনো ধরনের তথ্য মেলেনি।
এছাড়া গুলশান ২ নাম্বার এলাকার একটি বাসায় খালাফ প্রতিদিন রাতে আসা-যাওয়া করতেন। সেখানে কোনো বিষয়ে কারো সঙ্গে দ্বন্দ্বের জের ধরে তিনি খুন হতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছিল। ওই বাসায় যাতায়াতকারী কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করার পর খুনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। পরে সৌদি দূতাবাসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারেন, বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে সৌদি আরবের কোনো লোকজন বসবাস করেন না। মাঝে মধ্যে ট্যুরিস্টভিসায় কয়েকজন এলেও তারা বেশি দিন বাংলাদেশে অবস্থান করতেন না। এ কারণে পেশাগত কারণের দিকটাও ক্ষীণ।
পরবর্তীতে ছিনতাইকারীর হাতে খালাফ খুন হয়েছেন কিনা সেদিক ভেবে তদন্ত শুরু করা হয়। স্থানীয় ও আশপাশের বাড়ির লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, যেখানে খালাফের মরদেহ পড়ে ছিল, ওই স্থান থেকে সাদা রংয়ের গাড়িটি ১১৭ নাম্বার রোড দিয়ে দ্রুত চলে যায়। গাড়িতে চালকসহ আরো এক ব্যক্তি ছিল। তবে সে সময় গুলির কোনো শব্দ হয়েছিল কিনা প্রত্যক্ষদর্শীরা পুলিশকে তা নিশ্চিত করে জানাতে পারেননি। এরপর গুলশান এলাকার ১০টি ছিনতাইকারী গ্রুপকে শনাক্তের পর কয়েকজন সদস্যকে আটক করা হয়। পরে তাদের দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করেও খালাফের হত্যার সঙ্গে কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি।
এদিকে ঘটনার পর খালাফের মরদেহ থেকে উদ্ধার হওয়া টু-টু বোর গুলি নিয়ে ব্যালেস্টি পরীক্ষার জন্য সিআইডিতে পাঠানো হয়। সিআইডি রিপোর্টে গুলিটি আরমানি পিস্তল অথবা থ্রি-টু (৩২) রিভলবারে ব্যবহার করা হতে পারে বলে ধারণা দেয়া হয়। এরপর পুলিশের অতীত ক্রিমিনালি ফাইল ঘেটে গোয়েন্দারা জানতে পারেন, পয়েন্ট টু-টু বোর রাইফেলের গুলি সাধারণত ছোটমাপের আনাড়ি ছিনতাইকারিরা ব্যবহার করে থাকে। তবে আন্ডারওয়ার্ল্ডের সদস্যরা ঘটনাটি অন্যদিকে ঘোরানোর জন্য এই গুলি ব্যবহার করল কিনা তাও নতুন করে ভাবতে শুরু করেন গোয়েন্দারা। এরপর ডিবির নিজস্ব সোর্স নিয়োগ করে ঢাকার চিহ্নিত কয়েকজন সন্ত্রাসীর ওপর কড়া নজরদারি শুরু হয়। কয়েকজন সন্ত্রাসীর ফোন নাম্বার সংগ্রহ করে শুরু হয় কল ট্র্যাকিং। এতেও কোনো সুফল আসেনি।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির সিনিয়র এসি ওবায়েদ রহমান যায়যায়দিনকে জানান, হত্যাকা-টি 'ক্লু'লেস। কোনো সূত্র ধরেই আগানো সম্ভব হচ্ছে না। তবে খুনি যেই হোক তাকে ধরা পড়তেই হবে। পাশাপাশি খালাফ হত্যার ঘটনাটি একটি স্পর্শকাতর বিষয়। এ কারণে তাড়াহুড়ো করে কাউকে গ্রেপ্তার করা হবে না। শতভাগ নিশ্চিত হয়ে পুলিশ আসামি গ্রেপ্তার ও খুনের মোটিভ উদ্ধার করবে। তবে এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার বা আটক করা হয়নি। কয়েকজনকে শুধু জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। মামলার শুরু থেকে খালাফ হত্যার সম্ভাব্য প্রতিটি কারণ ক্রস চেক করে কোনো কিছুরই হিসাব মিলছে না।
মামলার ভবিষ্যৎ প্রশ্নে তিনি বলেন, আসামি গ্রেপ্তার ও খুনের কারণ উদ্ঘাটন করা না পর্যন্ত মামলার তদন্ত কাজ চলবে। এর মধ্যে আদালত যদি মামলার সর্বশেষ অবস্থা জানতে চান তাহলে প্রাথমিক তদন্ত আদালতকে জানানো হবে। তদন্তের স্বার্থে আদালতের কাছে আরো সময় চাওয়া হবে।