মামলার হিসাব
জানে না
বিএনপিযাযাদি ডেস্ক
সরকারবিরোধী আন্দোলনে নেতাকর্মীদের নামে রুজু হওয়া মামলার হিসাব জানে না বিএনপি। এক-এগারো পরবর্তী নির্বাচনে অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র শক্তির প্রধান বিরোধী দল হয়ে পড়া বিএনপির সাড়ে তিন বছরের তো নয়ই, গত মাস তিনেকের মামলার পরিসংখ্যানও রাখেনি কেন্দ্রীয় দপ্তর। খবর বাংলানিউজ
এমনকি বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের আইনি সহায়তা দিতে বিএনপি
চেয়ারপারসনের
উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেনের নেতৃত্বে গঠিত জাতীয় লিগ্যাল এইড কমিটিও জানে না দলের নেতাকর্মীরা কে কোথায় কতটি মামলার খাঁড়ায় ঝুলে আছেন।
দেশজুড়ে মামলায় নাস্তানাবুদ হতে থাকা নেতাকর্মীদের যথাযথ পরিসংখ্যান না থাকার পক্ষে অবশ্য বেশ শক্ত সাফাই-ই গাইছে বিএনপি দপ্তর। প্রতিনিয়তই নিত্যনতুন মামলা হতে থাকায় এ পরিসংখ্যান রাখা সম্ভব হচ্ছে না বলে দাবি প্রধান বিরোধী দলের।
তারা এও বলছে, কাজ চলছে। শিগগিরই হয়তো গত সাড়ে তিন বছরের মামলার একটি সঠিক তালিকা তৈরি করা সম্ভব হবে। শুধু তাই নয়, সারা দেশের মামলাগুলোকে বিভাগ ও জেলা অনুসারে বিন্যস্ত করারও পরিকল্পনা রয়েছে বিএনপির।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গত ১৬ এপ্রিল রাতে সাংগঠনিক সম্পাদক ইলিয়াস আলী নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ঢাকাসহ সারা দেশে বড় কলেবরের গোটা বিশেক মামলায় আট হাজার ৮৯০ জনকে আসামি করা হয়েছে। চাঁদাবাজি, হামলা ও ভাংচুরের অভিযোগে গত ১৮ এপ্রিল ইলিয়াস আলীর বিরুদ্ধে ২টি মামলা হয় বিশ্বনাথ থানায়।
সর্বশেষ মামলাটি হয় ৩০ মে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার তারাবো পৌরসভার বরাব এলাকায় গাড়ি ভাংচুরের ঘটনায় বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের ৩৩ কর্মীকে আসামি করে। এসব মামলায় বিএনপি নেতাকর্মীদের নামে চাঁদাবাজি, হামলা ও ভাংচুর, বিস্ফোরক বহন, পুলিশের কাজে বাধা দেয়া, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ ও পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগ আনা হয়েছে।
আর তৃণমূল নেতাকর্মী থেকে শুরু করে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পর্যন্ত এসব মামলার আসামি হয়ে আছেন। এদের অনেকেই জামিনে মুক্ত হলেও এখনো কারান্তরীণ থাকা নেতার সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়।
লিগ্যাল এইড কমিটির অন্যতম দুই নেতা সুপ্রিমকোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন ও ঢাকা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট ছানাউল্লাহ মিয়ার মুখোমুখি হলে উভয়েই মামলার সঠিক পরিসংখ্যান না জানার সত্যতা স্বীকার করেন।
সারা দেশের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলার সত্যিই কোনো তালিকা দলে নেই বলেও জানান তারা। কারণ জানতে চাইলে মাহবুব হোসেন বলেন, তালিকা করে লাভ কী? প্রতিদিন নতুন নতুন মিথ্যা মামলায় জড়ানো হচ্ছে কাউকে না কাউকে। সঠিক হিসাব পাওয়া যাবে না। তাই এই সরকার যতদিন ক্ষমতায় থাকবে কোনো তালিকা তৈরি হবে না। সেক্ষেত্রে প্রতিদিন এ তালিকা নবায়ন করতে হবে।
লাগাতার মামলায় খন্দকার মাহবুবের মতো অবশ্য ততটা হতাশ নন ছানাইল্লাহ মিয়া। শিগগিরই গ্রহণযোগ্য তালিকা তৈরির ব্যাপারে আশাবাদী এ আইনজীবী বলেন, এখনো সেভাবে তালিকা হয়নি, তবে এটি সামনেই হবে এবং অনেক কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য হবে।
অ্যাডভোকেট ছানাউল্লাহর মতোই অনেকটা একই অজুহাত দিচ্ছে বিএনপির কেন্দ্রীয় দপ্তর। একাধিক মামলার আসামি হওয়া কেন্দ্রীয় দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী এ প্রসঙ্গে বলেন, নিত্যদিনই তো নতুন নতুন মামলা হচ্ছে। তাই গত সাড়ে তিন বছরে কতটি মামলা হয়েছে তার হিসাব রাখা সম্ভব হয়নি। প্রতিদিন নানা অজুহাতে বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দুই হাজার থেকে আড়াই হাজার মামলা দেয়া হচ্ছে বলেও দাবি করেন রিজভী। 'তবে কাজ চলছে' জানিয়ে রিজভী বলেন, অচিরেই এসব মামলার তালিকা আসছে।
তিনি আরো জানান, বর্তমান সরকার গত সাড়ে তিন বছরে কতগুলো মামলা দিয়েছে এবং এগুলো কোন অভিযোগের ভিত্তিতে সেটি তালিকায় উল্লেখ থাকবে। সারা দেশের মামলাগুলোকে বিভাগ ও জেলা অনুসারেও বিন্যস্ত করা হবে।
বিশ্বনাথ ও নারায়ণগঞ্জের মামলা দুটি ছাড়াও রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপি নেতাকর্মী এবং পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় ১৯ এপ্রিল রাতে ৩০ জনের নাম উল্লেখসহ বিএনপির অজ্ঞাতপরিচয় পাঁচ হাজার নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা হয় পল্টন থানায়। তাদের বিরুদ্ধে গাড়ি ভাংচুর, অগি্নসংযোগ ও পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগ আনা হয়।
একই দিন ১৯ এপ্রিল মধ্যরাতে পুলিশের কাজে বাধা দেয়া এবং গাড়ি ভাংচুরের ঘটনায় মহানগর ছাত্রদলের সভাপতি আরিফুজ্জামান আরিফকে প্রধান আসামি করে খুলনা সদর থানায় বিএনপির তিন শতাধিক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা করে পুলিশ।
পুলিশের ওপর হামলা ও গোয়েন্দা পুলিশের গাড়ি ভাংচুরের অভিযোগে ২১ এপ্রিল রাত ৩টার দিকে হবিগঞ্জে বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের সাত শতাধিক নেতাকর্মীকে আসামি করে পুলিশ অ্যাসল্ট ও দ্রুত বিচার আইনে পৃথক দুটি মামলা হয়।
২২ এপ্রিল দুপুরে মিছিল থেকে পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগে সাতক্ষীরা সদর থানায় বিএনপির ৭৫ নেতাকর্মীর নামে মামলা করে পুলিশ। এ মামলায় অজ্ঞাতপরিচয় আরো ৩০০ থেকে ৪০০ ব্যক্তিকে আসামি করা হয়। ট্রাক ও রিকশা ভাংচুরের অভিযোগে ২৩ এপ্রিল সকালে ময়মনসিংহ বিএনপির ১৮ নেতাকর্মী-সমর্থকের বিরুদ্ধে কোতোয়ালি মডেল থানায় দুটি মামলা হয়।
২৪ এপ্রিল ওসি আহত হওয়ার ঘটনায় বগুড়ার কাহালু থানায় ১০ জনের নাম উল্লেখ করে ৫০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে পুলিশ। ২৯ এপ্রিলের হরতালে সচিবালয়ে ককটেল বিস্ফোরণ ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এলাকায় গাড়িতে আগুন দেয়ার অভিযোগে মির্জা ফখরুলসহ জোট নেতাদের বিরুদ্ধে দুটি মামলা হয় শাহবাগ ও তেজগাঁও থানায়।
তেজগাঁও থানার মামলায় প্রাথমিকভাবে ৩৮ জনকে ও শাহবাগ থানার মামলায় ২৮ জনকে আসামি করা হয়। পরে উভয় মামলায় আসামির সংখ্যা বেড়ে যায়।
জেলা দায়রা জজ আদালতের সামনে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় ২৯ এপ্রিল গভীর রাতে ১৩৫ বিএনপি নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা হয়। চট্টগ্রামে পুলিশের সঙ্গে বিএনপি-জামায়াতসহ ১৮ দলীয় জোটের কর্মীদের সংঘর্ষের ঘটনায় প্রায় এক হাজার ৭০০ নেতাকর্মীকে আসামি করে কোতোয়ালি থানায় চারটি মামলা করা হয়।
১৬ মে চট্টগ্রামে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) কার্যালয় থেকে বোমা তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধারের ঘটনায় এলডিপির ১৭ নেতাকর্মীর নামে মামলা হয় বিস্ফোরক আইনে। ১৬ মে একটি টেম্পোতে আগুন দেয়ার ঘটনায় ময়মনসিংহে বিএনপির ৩০০ নেতাকর্মীর নামে মামলা করা হয়। ১৭ মে বিএনপির ২২ নেতাকর্মীকে আসামি করে গাড়ি ভাংচুর ও অগি্নসংযোগের অভিযোগে মামলা করা হয় শ্রীপুর থানায়।
ঢাকা জজকোর্টে ভাংচুর ও বিশৃঙ্খলার ঘটনায় বিএনপি সমর্থক ৯৯ জন আইনজীবীর নামে ঢাকার কোতোয়ালি থানায় মামলা করা হয় ২২ মে রাতে। তবে ৩০ মে'র পর বৃহৎ পরিসরে নতুন কোনো মামলা রুজু হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি।