বাজার বেসামালপ্রতিদিন বাড়ছে নিত্যপণ্যের দাম : মনিটরিং নেই বললেই চলে : গোয়েন্দা নজরদারি অপর্যাপ্তআহমেদ তোফায়েল
রমজানের আগে নিত্য-পণ্যের বাজার বেসামাল হয়ে উঠেছে। প্রায় প্রতিদিনই বাড়ছে পণ্য মূল্য। নিয়ন্ত্রণহীন বাজারে সরকারের নির্দেশের পরও মূল্যতালিকা টাঙানো হয়নি, নেই পর্যাপ্ত মনিটরিং ব্যবস্থা। বাজারে গোয়েন্দা নজরদারি করার কথা বলা হলেও তা কোনো কাজে আসছে না। এ অবস্থায় হু-হু করে প্রায় প্রতিদিনই বাড়ছে নিত্যপণ্যের দাম।
সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্যে জানা যায়, গত ৫ দিনে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় অন্তত ৮ পণ্যের দাম নতুন করে বেড়েছে। পণ্যগুলো হলো- ভোজ্যতেল, আমদানিকৃত রসুন, মসুর ডাল (নেপালি), মুগডাল, আলু, পেঁয়াজ, আদা ও চিনি। এ ক্ষেত্রে চিনির দাম বেড়েছে কেজিতে ২ টাকা; খোলা সয়াবিন তেল লিটারপ্রতি ২ টাকা; রসুন কেজিতে ২০ টাকা; নেপালি মসুর ডাল ৩ টাকা; মুগডাল কেজিতে ৫ টাকা; আলু ২ টাকা; পেঁয়াজ ৫ টাকা এবং আদা ১০ টাকা।
টিসিবির তথ্যে বলা হয়েছে- ৫ দিনের ব্যবধানে বাজারে ৫৩ টাকার চিনি বিক্রি হচ্ছে ৫৫ টাকা; ২২ টাকার আলু ২৪ টাকায়; ৭০ টাকার আদা ৮০ টাকা; ৩০ টাকার পেঁয়াজ ৩৫ টাকা; ১১০ টাকার মুগডাল ১১৫ টাকা; ১১২ টাকার নেপালি ডাল ১১৫ টাকা; ৯০ টাকার আমদানিকৃত রসুন ১১০ টাকা এবং ১২২ টাকার লুজ সয়াবিন তেল ১২৪ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
আগামী সপ্তাহ থেকে বাড়তে পারে বোতলজাত ভোজ্যতেলের দাম। মিরপুর ১ নাম্বারের নোয়াখালী জেনারেল স্টোরের স্বত্বাধিকারী বাবলু জানান, আগামী সপ্তাহ থেকে আবার নতুন করে বোজলজাত ভোজ্যতেল কোম্পানি তীর ও রূপচাঁদা ব্র্যান্ডের লিটারপ্রতি আরো ৫ টাকা বাড়াবেন বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিরা জানিয়ে গেছেন।
এদিকে বর্তমান বাজারে যেখানে চিনির দাম ৫৩-৫৪ টাকা, সেখানে শিল্প মন্ত্রণালয় তাদের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের (বিএসএফআইসি) মাধ্যমে চিনি বিক্রি করছে ৬০ টাকা দরে। এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে দর কমে যাওয়ায় ভোজ্যতেলের দাম কমার কথা। কিন্তু বাণিজ্য সচিব মো. গোলাম হোসেন রমজানে তেলের দাম বাড়বে না বলে প্রকারান্তরে ব্যবসায়ীদের দাম না কমিয়ে বাড়তি মুনাফা করারই সুযোগ করে দিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এভাবেই সরকারের বিভিন্ন সংস্থার কা-জ্ঞানহীন সিদ্ধান্তের কারণে কমার পরিবর্তে অনেক পণ্যের দাম আরো বেড়ে যাচ্ছে।
জানা গেছে, তিন মাস আগে ২ লাখ টন চিনি আমদানি করতে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের নিয়ে ব্রাজিল সফর করেন শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়া। এর মধ্যে ৭০ হাজার টন চিনি আমদানির জন্য ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদন পাওয়া যায়। কিন্তু সেই চিনি শেষ পর্যন্ত আসেনি। শিল্প মন্ত্রণালয় গত ৪ জুলাই থেকে খোলাবাজারে চিনি বিক্রি শুরু করে। ওই দিন বাজারে চিনির দাম ছিল ৫২ টাকা। অথচ শিল্প মন্ত্রণালয়ের চিনির দাম নির্ধারণ করা হয় ৬০ টাকা।
মন্ত্রণালয় নিজেদের চিনির দাম বেশি নির্ধারণ করায় খুচরা বিক্রেতাদের বেশি দাম নেয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ভোক্তা অধিকার কর্মীরা। রাজধানীর মাত্র তিনটি স্থানে বাড়তি দামে চিনি বিক্রি করে শিল্প মন্ত্রণালয় পুরো দেশের বাজারকেই অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দিয়েছে বলে মনে করেন তারা।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর কাজীপাড়ার স্বপন স্টোরে খোলা চিনির দাম চাওয়া হয় ৫৮ টাকা কেজি আর প্যাকেটজাত চিনির দাম চাওয়া হয় ৬০ টাকা। অথচ একটু দূরের স্বপ্ন ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে ৫৪ টাকা দরে চিনি বিক্রি হচ্ছে। এ বিষয়ে স্বপন স্টোরের বিক্রেতার দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, সরকারিভাবে চিনির দাম ৬০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। তারা ২ টাকা কমে বিক্রি করছেন।
বাংলাদেশ পাইকারি চিনি ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আনোয়ার হাবিব বলেন, বর্তমানে চিনির বাজারে কোনো সঙ্কট নেই। সরবরাহ ঠিক আছে। দামও স্থিতিশীল। তারা ৪৮ টাকা দরে চিনি বিক্রি করছেন। শিল্প মন্ত্রণালয় খোলাবাজারে ৬০ টাকা দরে বিক্রি করায় তাদের ওপর চাপ পড়েছে। তারা এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান। এটা খুবই অন্যায়। তারা চান শিল্প মন্ত্রণালয় বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে চিনির দাম পুনর্নির্ধারণ করুক।
এদিকে রাজধানীসহ সারাদেশে দোকান ও বাজারে পণ্যের মূল্য তালিকা টাঙানোর জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশনা দেয়া হলেও তা কোথাও কার্যকর হয়নি। কারওয়ানবাজার, কাপ্তানবাজার, বাবুবাজার, ফকিরাপুল বাজার, আরামবাগ কাঁচাবাজার, মগবাজার কাঁচাবাজারের দোকানিদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, মূল্য তালিকা টাঙানোর বিষয়টি তারা জানেন না। ফেডারেশন অব চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) ও সরকারের পক্ষ থেকে তাদের কোনো নোটিশ দেয়া হয়নি। এ ব্যাপারে ফকিরাপুল বাজার মালিক সমিতির সভাপতি শওকত হোসেন কানন যায়যায়দিনকে বলেন, মূল্য তালিকা টাঙানোর জন্য তাদের কাছে কোনো নির্দেশনা আসেনি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আসন্ন রমজানে নিত্যপণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত ও মূল্য নিয়ন্ত্রণে সারাদেশে গোয়েন্দা নজরদারির সিদ্ধান্ত নিলেও তা কোনো কাজে আসছে না। অতীতের মতো ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে দাম বাড়িয়ে চলছেন। রজমানকে সামনে রেখে মজুদ গড়ে তুলছেন। মজুদ ভাঙার কোনো ঘটনাও চোখে পড়ছে না।
এ ব্যাপারে এফবিসিসিআই পরিচালক ও বাজার মনিটরিং সেলের আহ্বায়ক মো. হেলাল উদ্দিন জানান, আসন্ন রমজান মাসে নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের সরবরাহ ও বাজার মূল্য স্থিতিশীল রাখতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সরকার গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে মনিটরিং করলেও চাঁদাবাজি বন্ধ করতে পারেনি। এটা দুঃখজনক। চাঁদাবাজির কারণে দ্রব্যমূল্য বাড়ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তিনি জানান, রমজান মাসে ভোজ্যতেল, চিনি ও পেঁয়াজসহ কয়েকটি পণ্যের চাহিদা অনেক বেড়ে যায়। এগুলো গুদামে আনা পর্যন্ত ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নানাভাবে চাঁদা নেয়া হয়। গোয়েন্দা বাহিনী চাঁদাবাজির খবর দিচ্ছে কি না, তা তাদের বোধগম্য নয়।
বাজারে গিয়ে জানা গেছে, বাজার সহনীয় পর্যায়ে রাখতে রমজানের আগে মনিটরিং জোরদার করলেও কোনো কাজে আসছে না। অধিকাংশ বাজারে এখনো মনিটরিং টিম পেঁৗছেনি। যেগুলোতে মনিটরিং টিম গেছে সেখানে নানা কৌশলে ব্যবসায়ীরা তাদের এড়িয়ে গেছেন। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানান, প্রয়োজনের তুলনায় মনিটরিং টিমে পর্যাপ্ত জনবল নেই। তাই কাজ হচ্ছে ঢিমেতালে। মনিটরিং টিমে যারা কাজ করছেন তাদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। কেউ অভিযোগ করলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। এদিকে বাজার মনিটরিং বিষয়ে কোনো রকমের সমস্যা নেই বলে মন্তব্য করেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী জিএম কাদের। তিনি বলেছেন, গোয়েন্দা সংস্থাসহ মনিটরিং টিমগুলো যথাযথভাবে কাজ করছে।