পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ
মেঘনার ২২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার জালিয়াতিকমডোর জোবায়েরের অপকর্মের আরো চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁসযাযাদি রিপোর্ট কমডোর জোবায়ের আহমেদমেঘনার ২২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার জালিয়াতির অন্যতম খলনায়ক সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি শিপিং) কমডোর জোবায়ের আহমেদের অপকর্মের আরো চাঞ্চল্যকর বেশ কিছু তথ্য বেরিয়ে এসেছে। এই কেলেঙ্কারিতে তার সম্পৃক্ততার তথ্য-প্রমাণভিত্তিক একাধিক রিপোর্ট সম্প্রতি যায়যায়দিনে ছাপা হওয়ার পর তার সহকর্মীরাই এসব চমকপ্রদ তথ্য আমাদের হাতে তুলে দিয়েছেন। তারা জানিয়েছেন, দুর্নীতিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত জোবায়ের আহমেদ গোটা প্রতিষ্ঠানটি লুটেপুটে খেতে এবার তার অধীনস্থ কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও উৎসাহিত করছেন। এর প্রমাণ, অফিসিয়াল মিটিংয়ে তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, নিষ্ঠাবান সৎ কর্মকর্তাদের তার দরকার নেই, তার কাছে দুর্নীতিবাজরাই ভালো। এ সংক্রান্ত তার ভয়েস রেকর্ড যায়যায়দিন অফিসে সংরক্ষিত আছে।
দুর্নীতিবাজদের পক্ষ নিয়ে ডিজির প্রকাশ্য ঘোষণায় দুর্নীতিগ্রস্তরা উৎসাহিত হলেও সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের সৎ ও নিষ্ঠাবান কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে চরম হতাশা ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা বলছেন, ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে ক্ষমতাসীন সরকার যখন দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করেছে, ঠিক তখন সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী নিজ হাতে দুর্নীতির বিষবৃক্ষ রোপণ করে তাতে পানি ঢালছেন। নিজের অপকর্মের পথ সুগম করতে সহকর্মীদেরও দুর্নীতিগ্রস্ত করে তুলছেন।
বিক্ষুব্ধ কর্মকর্তাদের ভাষ্য, আমাদের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের প্রতীক
সশস্ত্র বাহিনী। দেশের যে কোনো সঙ্কটে তারা অগ্রসৈনিকের ভূমিকা পালন করেন। অথচ ইউনিফর্মধারী কমডোর জোবায়ের আহমেদ সমুদ্র পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হয়ে দুর্নীতির পাগলা ঘোড়ার পিঠে নিজেই সওয়ার হয়েছেন। এ অবস্থায় তিনি কিভাবে এখনো ডিজি শিপিংয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল রয়েছেন, তা নিয়ে খোদ সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা প্রশ্ন তুলেছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানান, কমডোর জোবায়ের আহমেদ একটি অফিসিয়াল মিটিংয়ে সৎ কর্মকর্তাদের অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করে দুর্নীতিবাজদের পক্ষে তার দৃঢ় অবস্থানের কথা ঘোষণা করেন।
কমডোর জোবায়েরের যে ভয়েস রেকর্ড যায়যায়দিনের কাছে সংরক্ষিত আছে, তার একাংশে তিনি বলেছেন, 'এর থেকে দুর্নীতিবাজগুলো ভালো। ও রকম সততা মারায়ে আমার কোনো দরকার নেই।'
ওই মিটিংয়েই কমডোর জোবায়ের আহমেদ সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের একজন নীতিবান এবং ধর্মপ্রাণ কর্মকর্তাকে উদ্দেশ করে অশ্লীল ভাষায় বলেন, 'বাইনচোত, হুজুর তোর পাছা দিয়ে ঢুকাই দিমু ব্যাটা।' এর পরক্ষণেই আবার তিনি গর্জে উঠে বলেন, 'তোর হুজুর-টুজুরগিরি পাছা দিয়ে ঢুকাই দিমু।' (কমডোর জোবায়ের আহমেদের মুখে উচ্চারিত অশ্লীল ও অসংযত এই শব্দচয়ন মুদ্রণের অযোগ্য হলেও তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বোঝানোর জন্য তা ছাপাতে বাধ্য হওয়ায় আমরা আন্তরিকভাবে দুঃখিত)
ওই মিটিংয়ে অংশগ্রহণকারী একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে যায়যায়দিনকে জানান, একজন কর্মকর্তাকে কমডোর জোবায়ের আহমেদ যে অশালীন ভাষায় যেভাবে গালাগালি করেছেন, তাতে ধর্মপ্রাণ মুসলিম কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ধর্মীয় অনুভূতিতে চরম আঘাত লেগেছে। এ নিয়ে তাদের মধ্যে চাপা অসন্তোষ বিরাজ করছে। এ ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে যে কোনো সময় এই ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটতে পারে।
দায়িত্বশীল একাধিক কর্মকর্তা জানান, গোটা সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরকে জোবায়ের আহমেদ যেভাবে তার লুটপাটের সাজানো বাগান বানিয়েছেন, তাতে নীতিবান কোনো কর্মকর্তার পক্ষে সেখানে টেকা সম্ভব নয়। তাই তারা সম্মিলিতভাবে তা প্রতিহত করার চেষ্টা করছেন। এর অংশ হিসেবে তার দুর্নীতির বিভিন্ন তথ্য বিভিন্ন মহলে পেঁৗছে দিচ্ছেন। তবে ধুরন্ধর জোবায়ের আহমেদ এটা বুঝতে পেরে এরই মাঝে দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়ে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন।
গত ২৯ আগস্ট দৈনিক যায়যায়দিনে 'কমডোর জোবায়ের আহমেদের সর্বাঙ্গে দুর্নীতির দুষ্টক্ষত' শিরোনামে যে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল, তাতে তার বিরুদ্ধে মেঘনার ২২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার জালিয়াতিতে জড়িত থাকার যে অভিযোগ তোলা হয়েছিল, তা যে শতভাগ সঠিক, এ ব্যাপারে কোনো সংশয় নেই বলেও ডিজি শিপিং অফিসের কর্মকর্তা মন্তব্য করেছেন।
মেঘনা কেলেঙ্কারিতে কমডোর জোবায়ের আহমেদের সম্পৃক্ততার তথ্য-প্রমাণভিত্তিক যেসব অভিযোগ আমাদের রিপোর্টে তুলে ধরা হয়েছিল, সেগুলো হচ্ছে_
যে কোনো জাহাজ কেনার পর নূ্যনতম সময়ের মধ্যে তা রেজিস্ট্রেশনের নিয়ম থাকলেও মেঘনা শিপ বিল্ডার্স তাদের 'মেঘনা প্রাইড' জাহাজটি ক্রয়ের ৮ মাস পর, অর্থাৎ ২০১১ সালের ৪ সেপ্টেম্বর মার্কেন্টাইল মেরিন ডিপার্টমেন্টে রেজিস্ট্রি করে। দীর্ঘ সময় পর জাহাজ রেজিস্ট্রি করার ব্যাপারে ডিজি শিপিং কমডোর জোবায়ের আহমেদ এবং পিওএমএমডি হাবিবুর রহমান কোনো আপত্তি তোলেননি। মেঘনার দুর্নীতি-জালিয়াতিতে প্রত্যক্ষভাবে সহায়তা করতেই তারা এ ব্যাপারে নীরব ভূমিকা পালন করেছিলেন বলে জাহাজ ব্যবসা সংশ্লিষ্টরা মন্তব্য করেছেন।
অবশ্য জোবায়ের আহমেদ এই অনিয়মের দায়ভার পিওএমএমডির ঘাড়ে চাপানোর চেষ্টা করেছেন। তিনি দাবি করেন, মার্কেন্টাইল মেরিন ডিপার্টমেন্ট রেজিস্ট্রেশন অথরিটি; এবং মার্চেন্ট শিপিং অধ্যাদেশ অনুযায়ী পিওএমএমডি শিপ রেজিস্টার। তবে মেরিন সংশ্লিষ্টরা জানান, পিওএমএমডি শিপ রেজিস্টার এবং ডিজি শিপিং পদাধিকার বলে রেজিস্টার জেনারেল। সুতরাং তার মদদ ছাড়া এই অনিয়ম সংঘটনের কোনো সুযোগ নেই এবং তিনি কোনোভাবেই এর দায়িত্ব এড়াতে পারেন না।
শিপিং ব্যবসায় সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, তার এই ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়েই কমডোর জোবায়ের আহমেদ মেঘনা শিপ বিল্ডার্সকে গোপনে জাহাজ বিক্রির জালিয়াতিতে সহায়তা করতে পিওএমএমডিকে দিয়ে অবৈধভাবে ঋণমুক্তির প্রত্যয়নপত্র দিয়েছেন।
পিওএমএমডি তা স্বীকার না করলেও তার কার্যক্রমে যায়যায়দিনের অভিযোগ যে সত্য, তা প্রমাণিত হয়েছে। কারণ, মেঘনা শিপ বিল্ডার্সকে অবৈধভাবে প্রত্যয়নপত্র দেয়ার জন্য অগ্রণী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তাকে চার্জ করে গত ৭ আগস্ট যে চিঠি দিয়েছে, পিওএমএমডি এখনো তার জবাব দেননি। আর কমডোর জোবায়ের যেহেতু এ ঘটনার নেপথ্য মদদদাতা, সেহেতু তিনি এ বিষয়ে পিওএমএমডির বিরুদ্ধে অফিসিয়াল কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি।
পরবর্তীকালে কমডোর জোবায়ের নিজের দুর্নীতির দায় শুধু পিওএমএমডির ঘাড়ে চাপাতে বাংলাদেশ ব্যাংক ও অগ্রণী ব্যাংকে নিজস্ব লোকজনকে দিয়ে তদবির করিয়েছেন, যদিও তাতে তেমন কোনো লাভ হয়নি।
এদিকে জাহাজ বিক্রির পর নূ্যনতম সময়ের মধ্যে জাহাজের নাম ডিলিশন করার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু 'মেঘনা প্রাইড' জাহাজটি গত জুন মাসে বিক্রি করা হলেও এখনো নাম ডিলিশন করা হয়নি। সংশ্লিষ্ট নথিতে এ জাহাজটি এখনো বাংলাদেশি পতাকাবাহী দেখানো হচ্ছে। মেঘনা কেলেঙ্কারির সঙ্গে ডিজি শিপিং এবং পিওএমএমডির সরাসরি সম্পৃক্ততা থাকায় মেঘনা এ ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি।
কমডোর জোবায়ের আহমেদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত এসব অভিযোগের ব্যাপারে যায়যায়দিনের প্রতিবেদকের সঙ্গে তার সরাসরি কথা হলেও তিনি তা খ-ন করতে পারেননি। পরবর্তীকালে তিনি যায়যায়দিন অফিসে যে প্রতিবাদপত্র পাঠিয়েছেন, তাতেও তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের যথাযথ কোনো জবাব ছিল না।
এছাড়া যায়যায়দিনের প্রতিবেদনে মেঘনা শিপ বিল্ডার্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা কামালের সঙ্গে জোবায়ের আহমেদের যে বিশেষ সম্পর্ক আছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে, তা মোস্তফা কামালের ব্যক্তিগত অনুষ্ঠানগুলোতে তার উপস্থিতিসহ বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করে প্রমাণ করা হয়েছে।
সমুদ্র পরিবহনের সৎ ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানান, যায়যায়দিনে প্রকাশিত কমডোর জোবায়ের আহমেদের দুর্নীতির সংবাদ শতভাগ সত্য। এ কারণেই তার দুর্নীতিবাজ সহযোগীরা ওই সংবাদের প্রতিবাদ করতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাপ দিলেও প্রথমে অনেকেই তা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছেন। পরে জোবায়ের আহমেদ নিজেই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হুমকি-ধমকি দিয়ে তাদের ওই প্রতিবাদের চিঠিতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করেন।
এর পাশাপাশি জোবায়ের আহমেদ নিজ দুর্নীতির কলঙ্ক মুছতে ব্যক্তিগত প্রভাব খাটিয়ে বিভিন্ন সংগঠনকে দিয়ে পত্র-পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে যায়যায়দিনে প্রকাশিত সংবাদের প্রতিবাদ জানান, যদিও তাতে কোনো ইতিবাচক ফল হয়নি। বরং এই অপচেষ্টায় তার মুখোশ আরো উন্মোচিত হয়েছে বলে তার সহকর্মীরা মন্তব্য করেছেন।
এদিকে ডিজি শিপিং জোবায়ের আহমেদ এবং তার সহযোগীদের অপকর্ম-দুর্নীতিতে ক্ষুব্ধ সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের সৎ কর্মকর্তারা এই চক্রের আরো বেশ কিছু অপকর্মের তথ্য-প্রমাণ যায়যায়দিন কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দিয়েছেন, যা যাচাই-বাছাই করে পরবর্তীকালে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করা হবে।
 
পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ
এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আপনার মতামত দিতে এখানে ক্লিক করুন
মেঘনার পেনডোরা বক্স -এর আরো সংবাদ
অনলাইন জরিপ
অনলাইন জরিপআজকের প্রশ্নগণজাগরণ মঞ্চের আবেদন এখন আর নেই_ বেসামরিক বিমান চলাচল মন্ত্রী রাশেদ খান মেননের এই বক্তব্যের সঙ্গে আপনি কি একমত?হ্যাঁনাজরিপের ফলাফল
আজকের ভিউ
পুরোনো সংখ্যা
2010 The Jaijaidin