পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ
মেঘনার ২২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার জালিয়াতিবেরিয়ে আসছে অনিয়ম দুর্নীতির নতুন তথ্যযাযাদি রিপোর্ট এমভি মেঘনা প্রাইডদেশের খ্যাতনামা শিল্পোদ্যোক্তা মেঘনা গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান মেঘনা শিপ বিল্ডার্স অ্যান্ড ডকইয়ার্ডের ২২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার জালিয়াতির ছক খুঁজতে গিয়ে এবার আরো ভয়াবহ তথ্য বেরিয়ে এসেছে। জানা গেছে, দুর্নীতিগ্রস্ত এই প্রতিষ্ঠানটি অগ্রণী ব্যাংকের মাধ্যমে এলসি খুলে জাহাজের মূল্য তিনগুণের বেশি দেখিয়ে ওভার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে বিপুল অংকের টাকা শুধু বিদেশে পাচারই করেনি, বরং এ নিয়ে আরো বড় ধরনের জালিয়াতি করেছে। অগ্রণী ব্যাংক, ডিজি শিপিং এবং পিওএমএমডি সম্মিলিত-ভাবে মেঘনা শিপ বিল্ডার্সকে এই অপকর্মে সহায়তা না করলে তাদের পক্ষে এই জালিয়াতি করা সম্ভব হতো না বলেও প্রমাণিত হয়েছে।
তথ্য অনুসন্ধানে জানা গেছে, মেঘনা শিপ বিল্ডার্স ২০১০ সালের নভেম্বর মাসে অগ্রণী ব্যাংকের ঋণপত্রের (এলসি) মাধ্যমে ২২ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে সিঙ্গাপুরি কোম্পানি থেকে নরওয়ের পতাকাবাহী জাহাজ এমভি শ্যারিনা (গঠ ঝণজঊঘঅ) ক্রয় করে। জাহাজের রেকর্ড (নথি) অনুযায়ী, ২০১০ সালের ১৫ ডিসেম্বর থেকে মেঘনা শিপ বিল্ডার্স অ্যান্ড ডকইয়ার্ড ওই জাহাজটির রেজিস্টার্ড ওনার (মালিক)। ওই বছর ১ ডিসেম্বর থেকে জাহাজটির নাম পরিবর্তন করে মেঘনা প্রাইড রাখা হয়। তবে জাহাজটির নরওয়ের পতাকা পরিবর্তন করে বাংলাদেশি পতাকাবাহী না করে উদ্দেশ্যমূলকভাবে তা করা হয় পানামার পতাকাবাহী।
এদিকে অগ্রণী ব্যাংকের নথিতে দেখা গেছে, ওই জাহাজটি ২০১১ সালের ২৯ আগস্ট মেঘনা শিপ বিল্ডার্স কর্তৃক বন্দর থেকে গৃহীত হয়েছে, যা ওই বছরের ৪ সেপ্টেম্বর মেরিন মার্কেন্টাইল ডিপার্টমেন্টে মেঘনা প্রাইড নামে রেজিস্ট্রি করা হয়। জাহাজের রেকর্ড অনুযায়ী, ২০১০ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে জাহাজটি বাংলাদেশি পতাকা বহন করছে।
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, মেঘনা শিপ বিল্ডার্স ২০১০ সালের ১৫ ডিসেম্বর থেকে জাহাজটির মালিক হলেও কেন তা সাড়ে ৮ মাস পর, অর্থাৎ ২০১১ সালের ২৯ আগস্ট গ্রহণ করেছে? বাংলাদেশি অর্থে কেনা জাহাজটি কেন ওই দীর্ঘ সময় পানামার পতাকা বহন করেছে? কী উদ্দেশ্যে তা পানামার পতাকাবাহী করা হয়েছে? মার্কেন্টাইল মেরিন ডিপার্টমেন্টে জাহাজটি রেজিস্ট্রেশনের আগে রেগুলেটরি বডি হিসেবে কেন পিওএমএমডি (প্রিন্সিপাল অফিসার অব মার্কেন্টাইল মেরিন ডিপার্টমেন্ট) ও ডিজি শিপিং জাহাজটি পুরনো রেকর্ড যাচাই করেননি? জাহাজটির ওই সাড়ে ৮ মাসের অর্জিত ভাড়া কে গ্রহণ করেছে এবং তা কোথায় জমা হয়েছে? জাহাজটির ভাড়া বাবদ অর্জিত অর্থ কেন দেশে রেমিট হয়নি? অগ্রণী ব্যাংকের ঋণের টাকায় কেনা ওই জাহাজটির উলি্লখিত বিষয়গুলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কেন খতিয়ে দেখেনি?
এসব তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনায় জাহাজ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বড় ধরনের জাল-জালিয়াতির উদ্দেশ্যেই বাংলাদেশের টাকায় কেনা জাহাজটি দীর্ঘদিন পানামার পতাকা বহন করেছে। ওই সময়ে অর্জিত জাহাজ ভাড়ার একটি বড় অংশ হয়তো বিদেশেই ডিজি শিপিং, পিওএমএমডি এবং অগ্রণী ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মধ্যে ভাগাভাগি হয়েছে। এ কারণেই হয়তো তারা পুরো বিষয়টি জেনেশুনেও এ ব্যাপারে নীরব থেকেছেন।
অভিজ্ঞজনরা বলছেন, সমুদ্রগামী প্রতিটি জাহাজের তৈরির সময় থেকে বর্তমান পর্যন্ত যাবতীয় হিস্ট্রি (ইতিহাস) ইন্টারন্যাশনাল ওয়েবসাইটেই রয়েছে। প্রয়োজনে তা যে কোনো সময় যাচাই করা যায়। এ বিষয়টি অগ্রণী ব্যাংক, পিওএমএমডি এবং ডিজি শিপিংয়ের স্বাভাবিকভাবেই জানা আছে। অথচ বিষয়টি কোনো রকম যাচাই না করেই পিওএমএমডি এবং ডিজি শিপিং তা মার্কেন্টাইল মেরিন ডিপার্টমেন্টে রেজিস্ট্রেশনের অনুমোদন দিয়েছে_ এটা অবিশ্বাসযোগ্য। মেঘনা শিপ বিল্ডার্সকে জালিয়াতিতে সহায়তা করতেই তারা সম্মিলিতভাবে এ কাজটি করেছে।
এদিকে অগ্রণী ব্যাংকের কাছে দায়বদ্ধ মেঘনা প্রাইড জাহাজটি গোপনে বিক্রির ক্ষেত্রে সহায়তা করতে মেঘনা শিপ বিল্ডার্সকে দেয়া দায়মুক্তির সার্টিফিকেটের জন্য ডিজি শিপিং পুরো দায়-দায়িত্ব পিওএমএমডির ঘাড়ে চাপিয়ে নিজের দায় এড়ানোর চেষ্টা করেছেন। তিনি দাবি করছেন, ডিরেক্টর জেনারেল শিপ রেজিস্ট্রার নন। কোনো জাহাজ মর্টগেজ থাকা সংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণ করতে তিনি আইন অনুযায়ী এখতিয়ারবান কর্তৃপক্ষ নন।
বাস্তবে বাংলাদেশের মার্কেন্টাইল মেরিন ল' অনুযায়ী পিওএমএমডি হচ্ছেন শিপ রেজিস্ট্রার এবং ডিজি শিপিং হচ্ছেন রেজিস্ট্রার জেনারেল। পিওএমএমডি রেজিস্ট্রার হিসেবে রেজিস্ট্রার জেনারেল ডিজি শিপিংকে নিয়মিত রিপোর্ট করে থাকেন।
রেকর্ড আছে, কমডোর জোবায়ের আহমেদ ডিজি শিপিং হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর বাংলাদেশের ক্রয়কৃত নতুন জাহাজ ইন্সপেকশন করে বাংলাদেশি পতাকার প্রি-রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট দেয়ার জন্য রেজিস্ট্রার জেনারেল হিসেবে বেশ কয়েকবার বিদেশ সফরে গেছেন।
এছাড়া ডিজি শিপিং জোবায়ের আহমেদ তার সময়কালীন সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের দক্ষতা, গতিশীলতা ও রাজস্ব বৃদ্ধির যে দাবি করেন, তাও অগ্রহণযোগ্য বলে মন্তব্য করেছেন শিপিং ব্যবসায়ীরা। তাদের ভাষ্য, যাদের শিপিং ব্যাকগ্রাউন্ড নেই, তাদের অনেকেই এ ব্যবসায় এসেছেন এটা ঠিক, তবে তারা শিপিং ব্যবসায় গতিশীলতা আনেননি। বরং মেঘনা শিপ বিল্ডার্সের মতো ভয়ঙ্কর জালিয়াতির মাধ্যমে তারা বিদেশে টাকা পাচারের উদ্দেশ্যে কেউ কেউ এই সেক্টরে এসেছেন, যা একটু খতিয়ে দেখলে সহজেই ধরা পড়বে।
এদিকে ২২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার জালিয়াতির মূল হোতা মেঘনা শিপ বিল্ডার্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা কামালের মুখোশও ইতোমধ্যেই জনসমক্ষে উন্মোচিত হয়েছে, যদিও তিনি এখনো তার এই কেলেঙ্কারি ঢাকতে মাঠে তৎপর রয়েছেন। তিনি তার পক্ষে বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠনকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছেন। তাদের কেউ কেউ ইতোমধ্যেই মেঘনা শিপ বিল্ডার্সের পক্ষে সাফাইও গেয়েছেন। তবে তাদের এই জালিয়াতির পক্ষে কোনো গ্রহণযোগ্য যুক্তি দাঁড় করানো কারো পক্ষে সম্ভব হয়নি।
একটি সংগঠন থেকে বলা হয়েছে, অগ্রণী ব্যাংক থেকে মেঘনা শিপ বিল্ডার্স যে ঋণ নিয়েছে, সেই দায় পরিশোধ করার সামর্থ্য মেঘনা কর্তৃপক্ষের রয়েছে। ওই সংগঠনটির প্রতি যথেষ্ট সম্মান ও শ্রদ্ধা রেখেই আমাদের প্রশ্ন, ডাকাতির পর লুণ্ঠিত অর্থ ফেরত দিলে কি তার অপরাধ মওকুফ হয়ে যাবে? যদি তা না হয়, তাহলে ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান অগ্রণী ব্যাংককে না জানিয়ে দায়মুক্তির মিথ্যা সার্টিফিকেট নিয়ে গোপনে জাহাজ বিক্রি করে দিয়ে অসৎ উদ্দেশ্যে ইস্টার্ন ব্যাংকের মাধ্যমে টাকা রেমিট করে মেঘনা শিপ বিল্ডার্স যে জালিয়াতি করেছে, তা কিভাবে ক্ষমার যোগ্য হবে?
আমাদের বিশ্বাস, প্রতিটি সংগঠনের এথিকস ও কোড অব কন্ডাক্ট রয়েছে। সেই অনুযায়ী সদস্যদের স্বার্থ দেখভাল করা সংগঠনের দায়িত্ব। কোনো দুর্নীতিবাজ-জালিয়াত সদস্যের পক্ষালম্বন করে কোনো সংগঠন সংশ্লিষ্ট সেক্টরকে ধ্বংসের কিনারে ঠেলে দেবে, তা কারোই কাম্য হতে পারে না। অথচ জাল-জালিয়াতির ভয়ঙ্কর কেলেঙ্কারি হাতেনাতে ধরা পড়ার পরও একটি সংগঠন দুঃখজনকভাবে মেঘনা শিপ বিল্ডার্স, ডিজি শিপিং ও পিওএমএমডির পক্ষে সাফাই গাওয়ার চেষ্টা করছে।
যায়যায়দিন দেশ ও জনগণের স্বার্থে দেশের অর্থ পাচারকারী ও জালিয়াত চক্রের স্বরূপ উন্মোচনে অঙ্গীকারবদ্ধ। পেশাগত দক্ষতার ভিত্তিতে অনুসন্ধানী দৃষ্টি দিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সেই প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। আমরা আশাবাদী, মেঘনা শিপ বিল্ডার্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা কামাল, অগ্রণী ব্যাংকের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা, ডিজি শিপিং কমডোর জোবায়ের আহমেদ এবং পিওএমএমডি ক্যাপ্টেন মো. হাবিবুর রহমানসহ যারা মেঘনা কেলেঙ্কারির সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত রয়েছেন, যায়যায়দিন শিগগিরই তাদের স্বরূপ জনসমক্ষে উন্মোচন করতে সক্ষম হবে।
 
পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ
এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আপনার মতামত দিতে এখানে ক্লিক করুন
মেঘনার পেনডোরা বক্স -এর আরো সংবাদ
অনলাইন জরিপ
অনলাইন জরিপআজকের প্রশ্নদেশে বিনিয়োগ বাড়াতে বাংকঋণের সুদহার ১২ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনার সুপারিশ করেছে অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি_ এতে আপনার সায় আছে কি?হ্যাঁনাজরিপের ফলাফল
আজকের ভিউ
পুরোনো সংখ্যা
2010 The Jaijaidin