মতামত :
¦
¦
সাকা চৌধুরীর সাফাই সাক্ষ্য গ্রহণ চলছেযাযাদি রিপোর্ট একাত্তরে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সংসদ সদস্য সালাউদ্দিন কাদের সাকা চৌধুরীর সাফাই সাক্ষ্য গ্রহণ অব্যাহত রয়েছে। বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ তার নিজের পক্ষে তৃতীয় দিনের মতো সাফাই সাক্ষ্য দেন সাকা চৌধুরী।
চেয়ারম্যান বিচারপতি এটিএম ফজলে কবিরের অনুপস্থিতিতে ট্রাইব্যুনালের সদস্য বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন ও বিচারপতি আনোয়ারুল হক সাক্ষ্যগ্রহণ করেন। সাফাই সাক্ষ্যগ্রহণ অসমাপ্ত অবস্থায় বৃহস্পতিবার পর্যন্ত মুলতবি করেছেন ট্রাইব্যুনাল।
তৃতীয় দিনের সাক্ষ্যে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনীকে ন্যাশনাল হেরিটেজ (জাতীয়
ঐতিহ্য) হিসেবে উল্লেখ করেন সাকা চৌধুরী। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনী বইয়ের ৯ থেকে ১১ পৃষ্ঠার কোনো এক জায়গায় বঙ্গবন্ধু দাবি করেছেন তার বিরুদ্ধে সর্ব প্রথম রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেপ্রণোদিত মামলাটি ছিল গোপালগঞ্জের একজন হিন্দু ভদ্রলোককে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার অভিযোগে।
সাকার এ বক্তব্যের বিরোধিতা করেন প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ সীমন।
এ সময় সাকা চৌধুরী বলেন, "আমি একজন অর্ধশিক্ষিত মানুষ। আপনাদের সামনে দাঁড়িয়েছি। একটা শব্দ বলেন, যেটা আমি ভুল বলেছি। এগুলো বলা কি কবিরা গুনাহ না ছগিরা গুনাহ?"
সাকা চৌধুরী বলেন, "বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী আমাদের জাতীয় ঐতিহ্য (ন্যাশনাল হেরিটেজ)। বাংলাদেশের জন্য এটি একটি ইতিহাস। এ বই প্রদর্শনীর (এক্সিবিট) দরকার নেই।"
বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী থেকে আসামি সাকা চৌধুরী বারবার রেফারেন্স দিতেই থাকলে প্রসিকিউশন তাতে জোর আপত্তি জানান। তখন সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, "আমার পারসেপশন, আমার বিশ্বাস তো আমার সাক্ষ্যেই যাবে।"
প্রসিকিউটর জেয়াদ আল মালুম এর বিরোধিতা করে বলেন, "এখানে তার (সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী) বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের বিষয়ে তিনি বক্তব্য দেবেন। একাত্তরের ২৫ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত ঘটে যাওয়া ঘটনার ওপরই তিনি সাক্ষ্য দেবেন।" "ট্রাইব্যুনালে বর্তমান সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিচার হচ্ছে না। বিচার হচ্ছে ৪০ বছর আগের সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর। তিনি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এসব কথা বলছেন।"
মালুম আরো বলেন, "এ পর্যন্ত আসামি ট্রাইব্যুনালে যা বলেছেন তার কিছুই যাবে না। তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের বিষয়ে তাকে বলতে হবে। যদি তিনি তা বলেন তাহলে তার বিরুদ্ধে আমাদের অন্য ধরনের অনুমতি নিতে হবে।"
এ সময় সাক্ষীর ডকে বসে থাকা সাকা চৌধুরী দাঁড়িয়ে বিস্ময়ের দৃষ্টিতে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে বলেন, "অন্য ধরনের অনুমতি বলতে আপনি কি বোঝাতে চাচ্ছেন?" তখন বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন সাকা চৌধুরীকে থামিয়ে দিয়ে প্রসিকিউটর জেয়াদ আল মালুমকে বলেন, "অন্য ধরনের অনুমতিটা কি? আপনাদের যদি কোনো আবেদন থাকে তাহলে ফাইল করুন, আমরা আপনার আবেদন দেখব।"
তখন সাকা চৌধুরী বলেন, "ট্রাইব্যুনালকে আমাদের সামনে থ্রেট (হুমকি) দেয়া হয়েছে। আমার আইনজীবীরা এমন করলে আদালত অবমাননার অভিযোগ আনা হতো।"
এ সময় ট্রাইব্যুনাল বলেন, "আমরা বিচার করতে বসেছি। কারো থ্রেটের (হুমকি) ওপর নির্ভর করবো না। আমরা শপথ নিয়ে বসেছি। তবে চৌধুরী সাহেব, আমরা আপনাকে পরামর্শ দিচ্ছি, আপনি আপনার মূল্যবান সময় নষ্ট করবেন না। অভিযোগের সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়ে বলেন।
আমরা আপনাকে সুযোগ দিচ্ছি। আপনার সাক্ষ্য আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে কতোটা সম্পর্কিত সেটাও আপনি দেখেন।"
এরপর ট্রাইব্যুনাল প্রসিকিউটর জেয়াদ আল মালুমকে বলেন, "তিনি (সাকা) অভিযুক্ত। তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ তিনি খ-ন করবেনই। এ সুযোগ তাকে দিতেই হবে।"
তখন সাকা চৌধুরী উত্তেজিত হয়ে বলেন, "টাইম ম্যানেজমেন্ট শিখাচ্ছেন।" এ প্রসঙ্গে তিনি গোলাম আযমের পক্ষে সাফাই সাক্ষী ছেলে বরখাস্তকৃত ব্রি. জেনারেল আবদুল্লাহ হিল আমান আজমীর প্রসঙ্গ টেনে বলেন, "আজমী সাহেব এখানে কতদিন সাক্ষ্য দিয়েছেন, এক মাস।"
তখন ট্রাইব্যুনাল সেটা সংশোধন করে দিয়ে তাকে বলেন, "এক মাস নয়, ১১ সেশন।"
সাকা চৌধুরী তখন বলেন, "তিনি তো আসামি ছিলেন না। দেড় বছরে আমার বিরুদ্ধে ৪১ জন সাক্ষী আনা হয়েছে। আর আমাকে একা সহ্য করতে পারছেন না?"
এছাড়াও সাকা চৌধুরী তার সাক্ষ্য প্রদানকালে এমন কিছু অশ্লীল শব্দ ব্যবহার করেছেন যা প্রকাশের অনুপযোগী।
এদিকে সাফাই সাক্ষ্য চলাকালে ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত একজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিককে গত তিন দিন ধরে দেখা যাচ্ছে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে বিভিন্ন তথ্য এবং শব্দচয়ণ করে সাহায্য করতে। সাক্ষ্য প্রদানকালে সাক্ষীকে এভাবে সাহায্য করার কোনো বিধান নাই বলে প্রসিকিউশনের একজন সদস্য জানান।
সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে গত বছরের ১৪ মে থেকে গত ১৩ জুন পর্যন্ত সাক্ষ্য দিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা মো. নূরুল ইসলাম ঘটনা ও জব্দ তালিকার সাক্ষী মিলিয়ে রাষ্ট্রপক্ষের ৪১ জন সাক্ষী। আর ৪ জন সাক্ষীর তদন্ত কর্মকর্তার কাছে দেয়া জবানবন্দিকেই সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেছেন ট্রাইব্যুনাল।
এর মধ্যে ঘটনার সাক্ষীরা হচ্ছেন- বাংলা একাডেমীর সভাপতি বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ড. আনিসুজ্জামান, চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী সলিমুল্লাহ, মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম সিরু বাঙালি, শহীদ নূতন চন্দ্র সিংহের ভাতিজা গৌরাঙ্গ সিংহ ও পুত্র প্রফুল্ল রঞ্জন সিংহ, শহীদ পরিবারের সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট নির্মল চন্দ্র শর্মা, আব্বাস উদ্দিন আহম্মেদ (আব্বাস চেয়ারম্যান), শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবি) উপাচার্য মো. সালেহ উদ্দিন, কামাল উদ্দিন, শহীদ পরিবারের সদস্য চপলা রানীসহ অনেকে।
আর জব্দ তালিকার সাক্ষীরা হলেন- বাংলা একাডেমীর সহকারী গ্রন্থাগারিক এজাব উদ্দিন মিয়া, চট্টগ্রামের রাউজান থানার জিআরও এএসআই মো. এরশাদুল হক, সাবেক জিআরও এসআই মোল্লা আবদুল হাই ও চট্টগ্রামের বিভাগীয় গণগ্রন্থাগারের বুক শর্টার কাওসার শেখ। তাদের জেরা সম্পন্ন করেছেন আসামিপক্ষ।
এছাড়া অন্য ৪ সাক্ষী মৃত জ্যোৎস্না পাল চৌধুরী, মৃত জানতি বালা চৌধুরী ও মৃত আবুল বশর এবং ভারতে থাকা বাদল বিশ্বাসের তদন্ত কর্মকর্তার কাছে দেয়া জবানবন্দিকেই সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেছেন ট্রাইব্যুনাল।
২০১০ সালের ২৬ জুন হরতালের আগের রাতে রাজধানীর মগবাজার এলাকায় গাড়ি ভাংচুর ও গাড়ি পোড়ানোর অভিযোগে সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে রমনা থানায় মামলা দায়ের করা হয়। ওই মামলায়ই সে বছরের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসের প্রত্যুষে গ্রেপ্তার করা হয় তাকে। ১৯ ডিসেম্বর একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয় তাকে। পরে ৩০ ডিসেম্বর আদালতের নির্দেশে প্রথমবারের মতো সাকা চৌধুরীকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।
একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ২০১১ সালের ৩ অক্টোবর তার বিরুদ্ধে অগ্রগতি তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে তদন্ত দল। একই বছরের ১৪ নভেম্বর সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র জমা দেয়া হয়। ১৮ নভেম্বর তার বিরুদ্ধে এ আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র গ্রহণ করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
৫৫ পৃষ্ঠার আনুষ্ঠানিক অভিযোগের সঙ্গে এক হাজার ২৭৫ পৃষ্ঠার আনুষঙ্গিক নথিপত্র এবং ১৮টি সিডি ট্রাইব্যুনালে জমা দেন প্রসিকিউশন।
গত বছরের ৪ এপ্রিল সাকার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন ট্রাইব্যুনাল। এতে তার বিরুদ্ধে একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় ২৩টি মানবতাবিরোধী অপরাধের উল্লেখ করা হয়। এসবের মধ্যে রয়েছে গণহত্যা, হত্যা, ধর্ষণ, অপহরণ করে গুডস হিলে নির্যাতন, দেশান্তরে বাধ্য করা, অগি্নসংযোগসহ বিভিন্ন অপরাধ। ৩ মে ও ৭ মে রাষ্ট্রপক্ষের প্রসিকিউশনের সূচনা বক্তব্য (ওপেনিং স্টেটমেন্ট) উপস্থাপন সম্পন্ন করার মধ্য দিয়ে শুরু হয় সাকা চৌধুরীর বিচার।
 
এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আপনার মতামত দিতে এখানে ক্লিক করুন
প্রথম পাতা -এর আরো সংবাদ
অনলাইন জরিপ
অনলাইন জরিপআজকের প্রশ্ননির্বাচন হবে না বলাটাই রাষ্ট্রদ্রোহিতা_ বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের এই বক্তব্যের সঙ্গে আপনি কী একমত?হ্যাঁনাজরিপের ফলাফল
আজকের ভিউ
পুরোনো সংখ্যা
2010 The Jaijaidin