মতামত :
¦
¦
তবুও আমারে দেব না ভুলিতেযাযাদি রিপোর্ট আজ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১১৪তম জন্মবার্ষিকী। ১১৪ বছর আগে এই দিনে পরাধীন বাঙালির মুক্তির বাণী নিয়ে অবিভক্ত বাংলায় ধূমকেতুর মতো জন্মগ্রহণ করেন এই কবি। তাই বাঙালির নিজেকে নতুনভাবে সৃষ্টি করারও দিন এটি।
দ্রোহ, প্রেম, সাম্য, মানবতা ও শোষিত মানুষের মুক্তির বার্তা নিয়ে আসা কবির ১১৪তম জন্মবার্ষিকীর দিনটি এবং কবির অমর সৃষ্টি 'বিদ্রোহী' কবিতার ৯০ বছরপূর্তিও জাতি গভীর শ্রদ্ধা ও বিনম্র ভালোবাসায় আজ উদযাপন করা হবে। জাতীয় কবির জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয়

নেতা বেগম খালেদা জিয়া জাতির উদ্দেশে পৃথক বাণী দিয়েছেন।
সকাল ১০টায় রাজধানী ঢাকার ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কবির জন্মবার্ষিকীর দুই দিনব্যাপী জাতীয় অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করবেন।
উল্লেখ্য, বাধার দুর্লঙ্ঘ পর্বত পাড়ি দেয়া এই কবির জন্ম ১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ জ্যৈষ্ঠ বর্ধমান জেলার আসানসোলের জামুরিয়া থানার চুরুলিয়া গ্রামে। তার ডাকনাম 'দুখু মিয়া'। পিতার নাম কাজী ফকির আহমেদ এবং মাতা জাহেদা খাতুন।
নজরুল বিশেষজ্ঞদের মতে, নজরুলের কাব্যসাধনা শুরু হয়েছিল একটি ক্রান্তিকালে। তার উদ্দেশ্য ছিল অত্যাচার-অবমাননার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ আর প্রতিবাদ এবং মানবিক জীবনের গভীরে মঙ্গলদায়িনী শক্তিরূপে বিরাজমান যে প্রেম ও সৌন্দর্যের চেতনা রয়েছে, তার উদ্বোধন। আর তা করতে গিয়েই একসময় সবাইকে চমকে দিয়ে তিনি বাংলার সাহিত্যাকাশে আত্মপ্রকাশ করেন দোর্দ- প্রতাপে। এ কারণেই তার কবিরূপে অভ্যুদয়কে কেবল তুলনা করা চলে ধূমকেতুর সঙ্গে।
নজরুল বিশেষজ্ঞরা আরো বলেন, প্রত্যয়, প্রতীতি ও শক্তিমত্তার পরিচয় দিতে গিয়ে অনেকটা মধুসূদনীয় কায়দায় আকাশচুম্বী দম্ভ ও অহঙ্কারেরই প্রতিধ্বনি তুলে তিনি (নজরুল) বলেছেন, 'আমি অজানা অসীম পূর্ণতা নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছি। এ আমার অহংকার নয়, আত্মবিশ্বাসের আত্মোপলব্ধির চেতনালব্ধ সহজ সত্যের সরল স্বীকারোক্তি।'
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সর্বগামী ও অসামান্য সৃষ্টিধারায় গোটা বাংলা সাহিত্য যখন প্লাবিত, ঠিক তখনই নজরুল 'আমি পরশুরামের কাঠের কুঠার,/নিষ্ক্রিয় করিব বিশ্ব, আনিব শান্তি শান্ত উদার!/আমি হল বলরাম- স্কন্ধে,/আমি উপাড়ি' ফেলিব অধীন বিশ্ব অবহেলে নব সৃষ্টির মহানন্দে।/মহাবিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত/আমি সেই দিন হব শান্ত/যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে-বাতাসে ধ্বনিবে না,/অত্যাচারীর খড়্গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না'_ এমন ঘোষণা দিয়ে বাংলা সাহিত্যে পা রাখেন।
রবীন্দ্র সৃষ্ট বিশাল জগতের পাশে কবি নজরুল গড়ে তোলেন নিজস্ব জগৎ। সেখানে ফুটিয়ে তোলেন স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। নজরুলের সৃষ্টিজগৎ রবীন্দ্রনাথের তুলনায় ক্ষুদ্র পরিসরের হলেও তা কোনোক্রমেই তুচ্ছ নয়; অবহেলার তো নয়ই। তাই স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ নজরুলের সদম্ভ অভ্যুদয়কে এই বলে স্বাগত জানিয়েছেন_ 'আয় চলে আয়রে ধূমকেতু, অাঁধারে বাঁধ অগি্নসেতু'।
নজরুল ইন্সটিটিউটের নির্বাহী পরিচালক বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক রশীদ হায়দার বাংলাদেশে নজরুল চর্চা সম্পর্কে বলেন, জাতীয় কবি হিসেবে তারা নজরুলকে সম্বোধন করছেন, গ্রহণও করেছেন। কিন্তু এখনো অনেকে তাকে খ-িতভাবে ব্যবহার করার চেষ্টা করছে।
ধর্মীয়ভাবে একটা রং দিয়ে কবিকে চিহ্নিত করার চেষ্টা জাতির জন্য সম্মানজনক নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, তার মতো অসাম্প্রদায়িক মানুষকে সাম্প্রদায়িক হিসেবে ব্যবহার করা জাতি এবং সাহিত্যের জন্য দুর্ভাগ্যজনক। কারণ, তিনি ধ্যানে-জ্ঞানে, নিঃশ্বাসে-বিশ্বাসে, চিন্তা-চেতনায় ছিলেন পুরাদস্তুর অসাম্প্রদায়িক। যখন সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়িয়ে মতলববাজরা ফায়দা লুটতে ব্যস্ত ছিল, তখনই কবি ঘৃণাভরে তাদের প্রতি অভিসম্পাত বর্ষণ করেছেন; এবং লিখেছেন, 'আল্লাহ্র তরবারী আর নারায়ণের গদা কোনদিনই ঠোকাঠুকি লাগবে না। কেননা আল্লাহ ওরফে নারায়ণ হিন্দুও নন, মুসলমানও নন। তার টিকিও নেই, দাড়িও নেই। তিনি সর্বনাম। সকল নাম গিয়ে মিশেছে তার মধ্যে।'
রশীদ হায়দার আরো বলেন, আজও সেই মতলববাজ, সুবিধাভোগী জঙ্গিগোষ্ঠী সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়িয়ে সমাজ ও রাষ্ট্রে সৃষ্টি করে চলেছে অস্থিরতা। মৌলবাদের উত্থানের এই ক্রান্তিকালে জাতীয় কবির সাম্য ও মানবতার বাণী থেকে আমাদের প্রেরণা নিয়ে জাতিকে জঙ্গিমুক্ত করে মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা এবং শোষণ-বঞ্চনামুক্ত সমাজ গড়তে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। কবির ভাষায় বলতে হবে_ 'ঐ নূতনের কেতন ওড়ে কালবোশেখীর ঝড়।/তোরা সব জয়ধ্বনি কর...।' সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গিবাদ রুখতে নূতনের কেতন ওড়ানোর বাণীই আজ সমাজের প্রতিটি স্তরে অনুরণিত করতে হবে।
নজরুল বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম বলেন, দ্রোহ-প্রেম-মানবতা কবির রচনাকে করেছে চিরন্তন, নিয়ে গেছে গণমানুষের কাছাকাছি। শোষিত-বঞ্চিত-নিপীড়িত মানুষের আর্তি বিশেষভাবে প্রকাশিত হয়েছে তার রচনায়। পাশাপাশি ঘৃণা, সাম্প্রদায়িকতা, কুসংস্কার এবং কূপম-ুকতার বিরুদ্ধেও চিরসোচ্চার তার রচনা। গণমানুষকে তিনি উদ্বুদ্ধ করেছেন সাম্য ও ন্যায়ের বন্ধনে একত্রিত হয়ে শোষণ, বঞ্চনা ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সংগ্রামে লিপ্ত হতে। তাই কবি গেয়েছেন_ 'গাহি সাম্যের গান/মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান...।' কবির এমন অজস্র রচনা ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে বীর বাঙালিকে দিয়েছে শক্তি এবং জুগিয়েছে প্রেরণা। এখনো সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে, শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে, সব গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামে তার রচনা আমাদের গভীরভাবে করে উদ্দীপ্ত।
এদিকে জাতীয় পর্যায়ে কবির জন্মবার্ষিকী পালনের লক্ষ্যে ঢাকা ছাড়াও চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহের ত্রিশাল এবং কুমিল্লার দৌলতপুরে বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। ত্রিশালে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করা হয়েছে। সকালে নজরুল একাডেমী মাঠের নজরুল মঞ্চে এই অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করবেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর।
জাতীয় পর্যায়ে নেয়া কর্মসূচির বাইরেও বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠন কবির জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এছাড়া দেশের অন্যান্য জেলায় স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে শিল্পকলা একাডেমীর সহযোগিতায় বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে যথাযোগ্য মর্যাদায় নজরুলের ১১৪তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন করা হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) জাতীয় কবির জন্মবার্ষিকী পালন উপলক্ষে আজ শোভাযাত্রা, কবির সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ এবং স্মরণসভার আয়োজন করেছে। স্মরণসভায় সভাপতিত্ব করবেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক।
নজরুলের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ছায়ানট দুই দিনব্যাপী নজরুল-উৎসবের আয়োজন করেছে। শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় শুরু হয় উৎসবের অনুষ্ঠান। প্রথম দিন নজরুল স্মারক বক্তৃতা করেন অধ্যাপক সনৎ কুমার সাহা। এছাড়া দুই দিনের আয়োজনে সম্মেলন এবং একক গান ছাড়াও আছে নৃত্য, পাঠ ও আবৃত্তি। উৎসবে অংশ নেবেন ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রবীণ-নবীন এবং প্রতিশ্রুতিশীল শিল্পীরা। এদিকে, চ্যানেল আই দিনব্যাপী নজরুল মেলার আয়োজন করেছে।
বাংলাদেশ বেতার, বাংলাদেশ টেলিভিশন এবং বিভিন্ন স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল কবির জন্মদিন উপলক্ষে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা প্রচার করছে। পত্র-পত্রিকায় বিশেষ সংখ্যা প্রকাশিত হবে। পাশাপাশি দিবসটি উপলক্ষে সরকারিভাবে একটি স্মরণিকা প্রকাশ করা হবে।
 
এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আপনার মতামত দিতে এখানে ক্লিক করুন
প্রথম পাতা -এর আরো সংবাদ
অনলাইন জরিপ
অনলাইন জরিপআজকের প্রশ্ননির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে সংলাপের আয়োজনে বিএনপির অনুরোধে সরকার সাড়া দেবে বলে কি মনে করেন?হ্যাঁনাজরিপের ফলাফল
আজকের ভিউ
পুরোনো সংখ্যা
2010 The Jaijaidin