মতামত :
¦
¦
চার হাজার মাদ্রাসার পরীক্ষা নিয়ে কওমি বোর্ডের দুশ্চিন্তাঅনিন্দ্য চৌধুরী, চট্টগ্রাম চার হাজার কওমি মাদ্রাসার চূড়ান্ত পরীক্ষা আয়োজনে সরকারি সহযোগিতা চায় কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ (বেফাক)। এতদিন কোনো ধরনের সরকারি নিয়ন্ত্রণ না মানলেও হেফাজতে ইসলামের সহিংস তৎপরতার পর সুর পাল্টেছে কওমি নেতাদের। পরীক্ষা চলাকালীন যে কোনো ধরনের পুলিশি অভিযান বন্ধে সরকারের প্রভাবশালী দুই কর্মকর্তার হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়েছে। চন্দ্রমাসের হিসাবে ১ অর্থাৎ ১১ জুন থেকে শুরু হতে যাচ্ছে কওমিপন্থীদের সর্ববৃহৎ পাবলিক পরীক্ষা। সরকারের সহযোগিতা চাওয়া হলেও মতিঝিল তা-বের ঘটনায় ক্ষুব্ধ প্রশাসন এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের আশ্বাস দেয়নি বলে সূত্র জানায়।
দেশে দুধরনের মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে কওমিপন্থীরা বরাবরই সরকারের নিয়ন্ত্রণের বিরোধিতা করে আসছে। প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার বাইরে থাকা এসব মাদ্রাসার কোনো কোনোটিতে উগ্র ধর্মীয় তৎপরতার অভিযোগ রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের অভিমত, এসব মাদ্রাসার অর্থের মূল উৎস মধ্যপ্রাচ্য। কোনো কোনো কওমি মাদ্রাসায় বাংলা, ইংরেজি, বিজ্ঞানের প্রবেশ নিষিদ্ধ। ২০০৯ সালে বিশ্বব্যাংক কওমি মাদ্রাসা সংক্রান্ত এক গবেষণা রিপোর্টে এসব মাদ্রাসার অর্থায়নের উৎস নিয়ে প্রশ্ন তুলে জঙ্গি নাশকতার ইঙ্গিত করা হয়েছিল। ২০১১ সালে সারাবিশ্বে সাড়া সাজানো উইকিলিকসও বাংলাদেশের কওমি মাদ্রাসার শিক্ষা ব্যবস্থা, অর্থায়ন এবং জঙ্গি প্রশিক্ষণ সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তবে কওমিপন্থীরা বরাবরই জঙ্গি তৎপরতার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
দেশে কওমিপন্থীদের সর্ববৃহৎ মাদ্রাসা বোর্ড বেফাকের চেয়ারম্যান হলেন শাহ আহমদ শফি। তার নেতৃত্বেই হেফাজতে ইসলাম নামের একটি সংগঠন সামপ্রতিক সময়ে লংমার্চ, ঢাকা অবরোধ এবং অবস্থান কর্মসূচি নিয়েছিল। এতে সরকারের কঠোর নজরদারির মধ্যে পড়েছেন কওমি মাদ্রাসাগুলো।
৫ মে মতিঝিলে হেফাজতের কর্মসূচি পরবর্তী ব্যাপক সহিংসতার পর ২০ মামলায় নাম উল্লেখ ছাড়াও অজ্ঞাতনামা লক্ষাধিক আসামি করা হয়েছে। যাদের প্রায় সবাই কওমি মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষক। ইতোমধ্যে পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়েছে দেশের সর্ববৃহৎ কওমি মাদ্রাসা হাটহাজারী মঈনুল ইসলামের প্রধান মুহাদ্দিস ও হেফাজতের মহাসচিব জুনায়েদ বাবুনগরী। গ্রেফতার আতঙ্কে পালিয়ে বেড়াচ্ছে বিভিন্ন মাদ্রাসার অন্তত ২০ শিক্ষক। ছাত্রদের মধ্যে বিরাজ করছে আতঙ্ক। এ অবস্থায় সমাপনী পরীক্ষা আয়োজনে ভাবনায় পড়েছে কওমি মাদ্রাসা বোর্ড।
এই কওমি বোর্ডের মহাসচিব মাওলানা আব্দুল জব্বার যায়যায়দিনকে বলেন, মাদ্রাসার শিক্ষক, ছাত্রদের মধ্যে গ্রেপ্তার আতঙ্কের কারণে তাদের শিক্ষা কার্যক্রমে সমস্যা হচ্ছে। মামলা মোকাদ্দমার ভয়ে অনেক মাদ্রসায় শিক্ষক এবং ছাত্রদের অনেকেই ক্লাসে যেতে পারছে না। অনেকে আত্মগোপনে আছেন।'
নানা ধরনের ভয়ভীতির অভিযোগ করে মাওলানা আবদুল জব্বার বলেন, মামলায় সুনির্দিষ্ট কয়েকশ' জনের নাম আছে। আর নাম ছাড়া লক্ষাধিক অভিযুক্ত করা হয়েছে। এ কারণে মাদ্রাসার শিক্ষকদের ধরার জন্য পুলিশের আনাগোনা আছে। আবার আওয়ামী লীগের কর্মীদেরও আনাগোনা আছে। তারা ভয়ভীতি দেখাচ্ছে। এ ধরনের কিছু তথ্য শোনা যাচ্ছে।
তিনি বলেন, দেশের চার হাজার কওমি মাদ্রাসায় ১ শাবান থেকে চূড়ান্ত পরীক্ষা শুরু হবে। হেফাজতের ঘটনার পর সবাই আতঙ্কে আছে। কাচপুরে একটি মাদ্রাসা বন্ধ করে দিয়েছে প্রশাসন। পরীক্ষা যাতে নির্বিঘ্ন হয় সেজন্য প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচটি ইমাম স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকুর সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে। তারা বিষয়টি সরকারের উচ্চপর্যায়ে জানানোর আশ্বাস দিয়েছেন। তবে প্রশাসন বলছে, ঢাকায় হেফাজতের অবস্থান কর্মসূচি থেকে সহিংসতার সঙ্গে জড়িতদের সুনির্দিষ্ট মামলায় গ্রেপ্তার অভিযান অব্যহত থাকবে। এটা মাদ্রাসা শিক্ষার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নয় ।
হাটহাজারী মাদ্রাসার শিক্ষক ও হেফাজতের সাহিত্য সম্পাদক আশরাফ আলী নিজামপুরী বলেন, হেফাজত কখনো জ্বালাও পোড়াও কর্মসূচি করেনি। পরীক্ষার কারণে মাদ্রাসার শিক্ষকরা এখন পাঠদান নিয়ে ব্যস্ত। প্রশাসনের ভয়ে ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষা কার্যক্রম। একই মাদ্রাসার মুহাদ্দেস ও হেফাজতের দপ্তর সম্পাদক ফোরকান আহমদ জানান, অনেক শিক্ষক পলাতক ও আটক থাকায় তাদের ক্লাস চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
সূত্র জানায়, কওমি মাদ্রাসাগুলো নিয়ন্ত্রণে সরকারের কোনো কাঠামো নেই। এসব মাদ্রাসার প্রতিনিধি নিয়ে বেসরকারি উদ্যোগে ঢাকায় কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড রয়েছে। ঢাকার বাইরে সিলেট, বগুড়াসহ বিভিন্ন জায়গায় পাঁচটি আঞ্চলিক বোর্ড রয়েছে। তবে সর্ববৃহৎ বোর্ড বেফাকের অধীনে চার হাজার মাদ্রাসায় সাত লাখ ছাত্র রয়েছে। বেফাকের মহাসচিব আবদুল জব্বার বলেন, পকেট কমিটি করতে বিভিন্ন সময়ে বেফাক থেকে পটিয়া মাদ্রাসা ও গোপালগঞ্জের গওহরডাঙ্গা মাদ্রাসার নেতৃত্বে পৃথক দুটি বোর্ড হয়েছে। এসব বোর্ডের অধীনে ২০০-৩০০ মাদ্রাসার বেশি নেই।
জানা যায়, ২০১০ সালের জুনে কওমি শিক্ষা ব্যবস্থাকে একটি কমিশনের অধীন পরিচালনা করার পরিকল্পনা করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে ওই বছরই ৬৪ জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে নিজ নিজ এলাকার সব কওমি মাদ্রাসার সংখ্যা, শিক্ষাক্রম, অর্থায়নসহ সার্বিক বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এরপর ২০১১ সালের ১৫ এপ্রিল কওমি মাদ্রাসার শিক্ষা ব্যবস্থাপনা, শিক্ষাদানের বিষয় এবং কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা সনদের সরকারি স্বীকৃতির লক্ষ্যে সুপারিশমালা প্রণয়নের জন্য 'বাংলাদেশ কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা কমিশন' গঠন করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। কমিশন গঠনের দীর্ঘ ২ বছর পর ১৩ এপ্রিল কমিশনের কো-চেয়ারম্যান মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসউদের নেতৃত্বে প্রতিনিধি দল কওমি মাদ্রাসা শিক্ষাকে সরকারি স্বীকৃতি দিতে প্রধানমন্ত্রীর কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে সুপারিশ জমা দিয়েছে। কিন্তু এরইমধ্যে স্বীকৃতির প্রসঙ্গে কওমি মাদ্রাসার নিয়ন্ত্রক আলেমরাই সরকারপন্থী ও বিরোধী দুই ধারায় বিভক্ত হয়ে গেছেন।
 
এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আপনার মতামত দিতে এখানে ক্লিক করুন
অনলাইন জরিপ
অনলাইন জরিপআজকের প্রশ্ননির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে সংলাপের আয়োজনে বিএনপির অনুরোধে সরকার সাড়া দেবে বলে কি মনে করেন?হ্যাঁনাজরিপের ফলাফল
আজকের ভিউ
পুরোনো সংখ্যা
2010 The Jaijaidin