মতামত :
¦
¦
অপ্রতিরোধ্য ডাকাততানভীর হাসান বিচিত্র এই পৃথিবীতে জীবন ও জীবিকার তাগিদে মানুষ বিভিন্ন সময়ে বহু বিচিত্র রকমের পেশা বেছে নেয়। কোনো পেশা বংশানুক্রমে বেছে নেয়া, কোনো পেশা আবার সমাজ বদলের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত পেশা হিসেবে বেছে নেয়া। এসব পেশাজীবনে আবার বৈধ এবং অবৈধ দুটি পন্থাও রয়েছে। একটি সমাজ ও রাষ্ট্র স্বীকৃত। অন্যটি সমাজ ও রাষ্ট্র অনুমোদন করে না। যেমন চুরি, ডাকাতি, খুন, ছিনতাই- এগুলো সামাজিকভাবে শুধু নিন্দনীয়ই নয়, রাষ্ট্রীয়ভাবেও দ-নীয় অপরাধ। কোনোটিতে দীর্ঘমেয়াদি শাস্তি থেকে সর্বোচ্চ শাস্তিও হয়ে থাকে। তবুও এতসব জেনেও কিছু মানুষ এই অন্ধকার জগতে পা রাখে। এরমধ্যে ডাকাতি পেশাটি পৃথিবীর প্রচীনতম পেশার একটি। সামাজিকভাবে এরা ঘৃণ্য হলেও রোমহর্ষকতার কারণে এদের কখনোই সামাজিকভাবে প্রতিরোধ করা যায়নি। ফলে তাদের প্রতিরোধের জন্য রাষ্ট্র বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীই ভরসা। অবশ্য কখনো গণপ্রতিরোধের মুখে পড়লে এদের অবস্থা ভয়াবহ ও রোমহর্ষকতাকেও ছাড়িয়ে যায়- এমন ঘটনাও বিরল নয়।
অনেকেই আছেন, যারা ডাকাতির অভিযোগে বিভিন্ন সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তারের পর জেল খেটেছেন বছরের পর বছর। ডাকাতিসহ হত্যার অভিযোগে কেউবা সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদ-েও দ-িত হয়েছেন। আবার অনেকে আছেন, যারা বছরের পর বছর কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠ থেকে ছাড়া পেয়ে পুনরায় ফিরে গেছেন পুরানো পেশায়। কথায় বলে, কয়লা যায় না ধুলে, স্বভাব যায় না ম'লে'। ডাকাতরা মানুষের কারো পদবি দেখে ডাকাতি করে না, কোথায় কেমন ধনসম্পদ আছে, সে হিসাব দেখে ডাকাতি করে। ফলে দেখা গেছে, তাদের ডাকাতির হাত থেকে রক্ষা পায়নি সেনা কর্মকর্তা থেকে শুরু করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বাসাবাড়িও। মূলত বেছে বেছে ধনাঢ্য লোকের বাসাবাড়ি এবং স্বর্ণের দোকান লুট করাই তাদের নেশা। এমন ভয়ঙ্কর রোমহর্ষক ১৭ জন ডাকাত এখন রাজধানী দাপিয়ে বেড়াচ্ছে, যাদের ধরতে পিছু নিয়েছে গোয়েন্দা পুলিশের একাধিক চৌকস দল।
চলতি মাসের একটি স্বর্ণের দোকান লুটের অভিযোগে ১১৩ ভরি গহনাসহ ফারুক হোসেন জুয়েল (২৭), মুকুল হোসেন (২৬) এবং আবু তালেব হাওলাদার (৩৫) নামে তিন ডাকাতকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। গ্রেপ্তারের পর তাদের ৫ দিনের রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করলে পুলিশের কাছে তাদের সব গুমর প্রকাশ করে দেয়।
এ বিষয়ে ডিএমপি কমিশনারের মুখপাত্র ও ডিবির জয়েন্ট কমিশনার মনিরুল ইসলাম যায়যায়দিনকে জানান, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় তিনটি গ্রুপের ১৫ থেকে ১৭ জন জুয়েলারি ডাকাত তৎপর রয়েছে। মূলত বাসাবাড়ি, জুয়েলারি এবং ব্যাংক ডাকাতিই তাদের লক্ষ্য। এদের অনেককে বিভিন্ন সময় ডাকাতি মামলায় গ্রেপ্তার করে জেলখানায় পাঠানো হয়েছে। সম্প্রতি একে একে সবাই জামিনে বের হয়ে বিভিন্ন জুয়েলারি দোকানে আবার ডাকাতি শুরু করেছে। তাদের গ্রেপ্তারে ডিবির একাধিক টিম মাঠে নেমেছে।
তিনি আরো জানান, ডাকাত দলের কোনো কোনো সদস্য একাধিকবার গ্রেপ্তার হয়েছে। এ কারণে তারাও পুলিশের প্রযুক্তি সম্পর্কে আগের চেয়ে অনেক সজাগ। ফলে তারা এখন খুব সতর্কতার সঙ্গে চলাফেরা করছে। একেবারে ঘনিষ্ঠজন ছাড়া কারো সঙ্গে যোগাযোগ রাখে না। অনেকে দেশের বিভিন্ন প্রত্যন্ত এলাকায় পালিয়ে গেছে। সম্প্রতি একটি জুয়েলারি দোকানে ডাকাতি শেষে ডাকাত দলের সদস্যরা তাদের একটি মোবাইল ফোন ফেলে যায়। মোবাইল ফেনের সূত্র ধরেই কয়েকজনকে গ্রেপ্তারের পর কিছু স্বর্ণ উদ্ধার করা সম্ভব হয় এবং ওই ১৭ জনের নাম বেরিয়ে আসে।
ডিএমপি কমিশনারের মুখপাত্রের সঙ্গে একমত পোষণ করে ডিবি পশ্চিমের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার মশিউর রহমান যায়যায়দিনকে জানান, এসব ডাকাত দলের টার্গেট ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার ছোট ছোট জুয়েলারি দোকান। কারণ, জুয়েলারি দোকানে ডাকাতি করে লাভ বেশি হয়। আর ধরা পড়লেও এসব গহনা বিক্রি করে খুব সহজেই জামিনে বেরিয়ে আসা যায়।
তিনি জানান, গত বছরের শুরুতে গুলশানের ইকবাল সেন্টারের স্বর্ণের দোকানে ডাকাতির ঘটনায় সর্বশেষ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়। এর আগে ব্র্যাক ব্যাংকের লকারে ডাকাতির ঘটনায় কয়েকজন দীর্ঘদিন ধরে জেলখানায় ছিল। এরপর থেকে রাজধানীতে ডাকাতির ঘটনা কমে যায়। সম্প্রতি জেলখানা থেকে বের হয়ে এরা পুরানো পেশায় ফিরে এসেছে এবং একের পর এক সোনার দোকানে ডাকাতি ঘটিয়ে যাচ্ছে।
তিনি আরো জানান, ডাকাত দলের সদস্যদের মধ্যে রয়েছে- ইয়াকুব মাল ওরফে কাল্যাইয়া, আমির হোসেন ওরফে হামজা, মোহাম্মদ মিলন, চান্দু কর্মকার, ফারুক শিকদার, জুয়েল মৃধা, কবির হোসেন এবং মোহাম্মদ সগির। এদের গত বছরের ১ জুলাই শুলশানের ইকবাল সেন্টারে ডাকাতি মামলায় জেলখানায় পাঠানো হয়। সম্প্রতি তারা সবাই জামিনে বের হয়ে এসেছে।
এর বাইরে আরো একটি গ্রুপ রয়েছে। তারা হলো- নেত্রকোনার রাজা খলিফা, সাভারের রাসেল, ময়মনসিংহের কানা শামিম ওরফে শামিম এবং বরিশালের কাঞ্চন ও রোকেয়া বেগম।
জানা গেছে, গত বছরের ১৩ জানুয়ারি পল্টন থানার ৫০ গজ দুরে পল্টন মার্কেটের সামনে সানফ্লাওয়ার জুয়েলারি দোকান থেকে সাড়ে ৭ কোটি টাকা মূল্যের ১ হাজার ২০০ ভরি গহনা ডাকাতি হয়। এ ঘটনায় পল্টন থানা পুলিশ চারজনকে গ্রেপ্তার করে এবং ৬৫ ভরি গহনা উদ্ধার করে। পরে মামলাটি ডিবিতে স্থানান্তর করা হয়। পরে ডিবি আরো চারজনকে গ্রেপ্তার করে এবং ৩৪ ভরি স্বর্ণ উদ্ধার করে।
গত ৪ জানুয়ারি রাজধানীর বিজয়নগর এলাকায় ডাক্তার দম্পত্তি ডা. আবুল কালাম আজাদ এবং ডা. দিলারা বেগমের বাসায় হানা দিয়ে প্রায় ৮০ ভরি স্বর্ণালঙ্কার নিয়ে যায় সংঘবদ্ধ ডাকাত দল। এর দুদিন আগে রামপুরায় একটি জুয়েলারি দোকান থেকে ২০ ভরি স্বর্ণের গহনা ডাকাতি করে দুর্বৃত্তরা। এ দুটি ঘটনার কোনো মালামাল উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ। এছাড়া একই বছরের মাঝামাঝিতে মোহাম্মদপুরের এক সেনা কর্মকর্তার বাসা থেকে লুট করা হয় প্রায় অর্ধকোটি টাকার মালামাল। এরমধ্যে গহনার পরিমাণ বেশি ছিল। এ ঘটনায় কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং কিছু মালামাল উদ্ধার করা হয়।
গত ২৪ জানুয়ারি রাতে রাজধানীর কাফরুলে একটি মার্কেটের দারোয়ানদের হাত-পা বেঁধে মমতা তৈয়বা জুয়েলারি দোকান থেকে কোটি টাকার ১৬১ ভরি গহনা লুট করে নিয়ে যায় সশস্ত্র ডাকাত দলের সদস্যরা।
গত ১ ফেব্রুয়ারি ইস্টার্ন প্লাজা শপিং কমপ্লেক্সের গ্রামবাংলা জুয়েলারি থেকে ৭৭৫ ভর্তি সোনার গহনা ডাকাতি হয়। সংঘবদ্ধ ডাকাত দলের সদস্যরা ডুপ্লিকেট চাবি দিয়ে তালা খুলে গ্রামবাংলা নামের ওই জুয়েলারি দোকান থেকে ৭৭৫ ভরি স্বর্ণালঙ্কার লুট করে নিয়ে যায়।
এছাড়া, গত ১৩ ফেব্রুয়ারি উত্তরার আজমপুর এলাকার একটি গহনার দোকানের কর্মচারীকে খুন করে ১৫ লাখ টাকা মূল্যের ৩০ ভরি গহনা লুট করা হয়। ৬ ফেব্রুয়ারি রামপুরা ওয়াপদা রোডের একটি স্বর্ণের দোকানে দুর্ধর্ষ ডাকাতির ঘটনা ঘটে। ডাকাত দলের সদস্যরা ১৫২ ওয়াপদা রোডের সুমন জুয়েলার্স থেকে দোকানের সিন্দুকসহ ৭০ ভরি স্বর্ণালঙ্কার, আড়াই কেজি রুপা এবং নগদ ৮২ হাজার টাকা লুট করে নিয়ে যায়। সুমন জুয়েলার্সের মালিক সুমন জানান, ঘটনার আগের রাতে তিনি দোকান বন্ধ করে বাসায় চলে যান। প্রতিদিনের মতো রাতে তিনি সব স্বর্ণালঙ্কার এবং নগদ টাকা দোকানে রক্ষিত ছোট আকারের সিন্দুকের ভেতরে রেখে যান। ঘটনার দিন সকালে তিনি দোকান খুলতে এসে দেখতে পান দোকানের শার্টারে লাগানো ৭টি তালাই ভাঙা। এরপর ভেতরে প্রবেশ করে দেখতে পান সিন্দুকটি ভেতরে নেই। তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে ৭০ ভরি স্বর্ণালঙ্কার, আড়াই কেজি রুপা এবং নগদ ৮২ হাজার টাকাসহ সিন্দুকটি নিয়ে গেছে। এ ঘটনার পর তিনি রামপুরা থানায় একটি মামলা করেন।
গোয়েন্দা পুলিশের এসি তৌহিদুল ইসলাম পিপিএম যায়যায়দিনকে জানান, ২০০১ সালের ১৮ ডিসেম্বর পল্টন এলাকার একটি জুয়েলারি দোকানে ডাকাতি হয়। ডাকাতরা ওই সময় তিন হাজার ভরি স্বর্ণ লুট করে। এ ব্যাপারে ১৯ ডিসেম্বর তৎকালীন মতিঝিল থানায় একটি মামলা হয়। মামলা নাম্বার ৬১। মামলার ৭ দিনের মাথায় সিআইডি পুলিশ সাগর নামে এক যুবককে গ্রেপ্তার করে। তার স্বীকারোক্তি অনুযায়ী গ্রেপ্তার করা হয় সৈয়দ নাসির উদ্দিন ওরফে জসিম, শুকুর আলী ওরফে লালমিয়া এবং পরিতোষ নামে তিন ডাকাতকে। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় ১৫০ ভরি স্বর্ণ। সম্প্রতি এসব ডাকাত দলের সদস্যরা জামিনে বের হয়ে মিরপুর এলাকায় আস্তানা গাড়ে। দলটিকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। তাদের গ্রেপ্তার করতে গোয়েন্দা পুলিশের কয়েকটি টিম মাঠে তৎপর রয়েছে।
সর্বশেষ ২০১২ সালের ২৪ ডিসেম্বর কাফরুলের রজনীগন্ধা মার্কেটের স্বর্ণালী জুয়েলার্স থেকে ৫০১ ভরি স্বর্ণের গহনা লুট হয়। এ ঘটনায় ওই দোকানের মালিক সামসুল হক বাদী হয়ে একটি মামলা করেন। পরবর্তীতে মামলাটি ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরপর থেকে মামলাটির তদন্ত শুরু করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সিনিয়র এসি তৌহিদুল ইসলাম। তদন্তের একপর্যায়ে তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানতে পারেন, ঘটনার দিন একটি মাইক্রোবাসযোগে কয়েকজন লোক গভীররাতে ওই এলাকায় ঘোরাফেরা করছিল। এরপর তারা ওই গাড়িটি গোপন সোর্সের মাধ্যেমে শনাক্ত করেন। পরে ভাষানটেক থানা পুলিশের সহায়তায় আবু তালেব নামে এক ডাকাতকে ডিবি পুলিশ আটক করে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আবু তালেব ডাকাতির সঙ্গে জড়িত থাকার কথা পুলিশের কাছে স্বীকার করে। এরপর তালেবের সাহায্যে জুয়েলের দোকানের কর্মচারী মুকুল হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তীতে ওই দোকান লুটের ১১৩ ভরি গহনাসহ ফারুক হোসেন জুয়েলকে গ্রেপ্তার করা হয়।
 
এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আপনার মতামত দিতে এখানে ক্লিক করুন
প্রথম পাতা -এর আরো সংবাদ
অনলাইন জরিপ
অনলাইন জরিপআজকের প্রশ্নসংলাপে তৃতীয় পক্ষে মধ্যস্থতার দরকার নেই_ মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান ডবিস্নউ মজিনার এই বক্তব্যের সঙ্গে আপনি কি একমত?হ্যাঁনাজরিপের ফলাফল
আজকের ভিউ
পুরোনো সংখ্যা
2010 The Jaijaidin