শনিবার, মে, ২৫, ২০১৩: জ্যৈষ্ঠ ১১, ১৪২০ বঙ্গাব্দ: ১৪ রজব , ১৪৩৪ হিজরি, ০৭ বছর, সংখ্যা ৩৪২ |
| গুগল ওয়েব অনুসন্ধান | অনুসন্ধান |
|
কোন আদালতে মামলা হবে আর কে বিচার করবে?ঘোড়ার আগেই গাড়ি
জুড়তে ব্যস্ত সরকাররাজধানী ছাড়া দেশের অন্য কোনো জেলা বা মহানগরে নিরাপদ খাদ্য আদালত গঠন না করেই নিরাপদ খাদ্য আইন প্রণয়নের উদ্যোগসাখাওয়াত হোসেন ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দিলে কেমন হবে_ তা পরখ করে কেউ নিজের নির্বুদ্ধিতার প্রমাণ করতে না চাইলেও বর্তমান সরকার এমন কা- ঘটাতেই ওঠেপড়ে লেগেছে। রাজধানী ঢাকা ছাড়া দেশের অন্য কোনো জেলা বা মহানগরে খাদ্য আদালত না থাকলেও নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩ বা 'পিওর ফুড অর্ডিন্যান্স' প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বাজেট অধিবেশনের প্রথম দিকে আইনটি পাস করানোর জন্য খাদ্য মন্ত্রণালয় সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছে। অথচ হাইকোর্ট নির্দেশ দেয়ার পর চার বছর পার হতে চললেও এখনো নিরাপদ খাদ্য আদালত গঠন করা হয়নি। এ অবস্থায় নিরাপদ খাদ্য আইন পাস হলে এ আইনে কোন আদালতে মামলা হবে এবং কে তার বিচার করবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিজ্ঞজনরা বলছেন, আদালত গঠন না করেই আইন প্রণয়নে তোড়জোড় শুরু করে খাদ্য মন্ত্রণালয় প্রকান্তরে সরকারকে বিব্রতকর পরিস্থিতিরই মুখোমুখি করতে যাচ্ছে। কেননা ১৯৫৯ সালের বাংলাদেশ বিশুদ্ধ খাদ্য অধ্যাদেশ আইনটি ২০০৫ সালে সংশোধনী এনে তাতে বলা হয়েছে_ 'খাদ্যে ভেজাল পেলে যে কেউ স্থানীয় খাদ্য-আদালতে মামলা করতে পারেন। সে ক্ষেত্রে ওই খাদ্যদ্রব্য বা খাদ্য-উপাদান যে ভেজাল এই মর্মে খাদ্য বিশ্লেষকের সার্টিফিকেট আদালতে দাখিল করতে হবে। তবে মামলার কার্যক্রম শুরু করতে দরকার একই বিষয়ে খাদ্য পরিদর্শক বা খাদ্য বিশ্লেষক কিংবা সরকার অনুমোদিত কোনো ব্যক্তির লিখিত অভিযোগ।' এ অধ্যাদেশ অনুযায়ী দেশের যে জেলা শহরে খাদ্য আদালত নেই, সেখানে মামলা করারও কোনো সুযোগ নেই। সুতরাং জেলায় জেলায় খাদ্য আদালত গঠনের আগে নতুন আইন প্রণয়ন যে নেহাত 'ভাওতাবাজি' তা বোঝার ক্ষমতা একজন শিশুরও রয়েছে। তবে খাদ্যমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাকের দাবি, উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত ভেজালমুক্ত খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্যই এই আইন প্রণয়নে তোড়জোড় চলছে। খাদ্যে ভেজাল রোধে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় এবং অধিদপ্তরের কাজে সমন্বয়হীনতার কঠোর সমালোচনা করে মন্ত্রী বলেন, নতুন এ আইন প্রণয়ন হলে এসব বাধা দূর হয়ে যাবে। নতুন আইনে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ গঠনের সুপারিশ দেয়া হয়েছে। এ প্রতিষ্ঠানটির মূল কাজ হবে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা এবং সমন্বয়হীনতা দূর করা। মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, নতুন এই আইনটি প্রণয়নের সঙ্গে সঙ্গে ১৯৫৯ সালের পিওর ফুড অর্ডিন্যান্স বাতিল হয়ে যাবে। তবে ওই আইনে বিচারাধীন কোনো মামলা থাকলে তা ওই আইনের আওতায় বিচার সম্পন্ন হবে। কিন্তু ঢাকা ছাড়া দেশের অন্য কোনো জেলায় ভেজালখাদ্য পণ্য উৎপাদন বা বিপণন হলে কোন আদালতে মামলা হবে সংশ্লিষ্টরা এর কোনো সদুত্তোর দিতে পারেনি। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণে কাজ করছে এ ধরনের সংগঠনগুলো বলছে, ভেজালখাদ্য উৎপাদনকারী প্রভাবশালীদের চাপের মুখেই বিশুদ্ধ খাদ্য আদালত গঠনের প্রক্রিয়া থমকে আছে। এ ষড়যন্ত্রে আমলাদেরও সম্পৃক্ততা রয়েছে। তবে খাদ্য ও আইন মন্ত্রণালয় একে অপরের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে দায় সারানোর চেষ্টা করছে। আইন মন্ত্রণালয়ের দাবি, জেলায় জেলায় বিশুদ্ধ খাদ্য আদালত প্রতিষ্ঠায় তারা প্রস্তুত। প্রজ্ঞাপনের একটি খসড়াও তৈরি হয়ে আছে। এখন প্রয়োজন শুধু খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অনুরোধপত্র। অনুরোধপত্র পেলেই প্রজ্ঞাপন জারি হবে। তবে খাদ্য মন্ত্রণালয় বলছে, এ বিষয়ে কোনো অনুরোধ পাঠানো হবে না। জানা গেছে, ভেজাল খাদ্য রোধে এরই মধ্যে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে বিশুদ্ধ আদালত প্রতিষ্ঠার অনুরোধ জানিয়ে খাদ্য মন্ত্রণালয় এবং আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেয়া হয়েছে। বিষয়টি নীতিগতভাবে অনুমোদন করে তা পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য আইন ও সংসদবিষয়ক (লেজিসলেটিভ পার্লামেন্টারি অ্যাফেয়ার্স ডিভিশনে) বিভাগে পাঠিয়েছে আইন মন্ত্রণালয়। এখন বিশুদ্ধ খাদ্য আদালত প্রতিষ্ঠায় খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অনুরোধপত্র পেলেই প্রজ্ঞাপন জারি করবে আইন মন্ত্রণালয়। এদিকে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ভেজাল নিয়ন্ত্রণে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব কোনো আইন নেই। অথচ আদালত পিওর ফুড-সংক্রান্ত আইন সংশোধন করতে বলেছে। আইনটি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের। ফলে এখানে খাদ্য মন্ত্রণালয় কোনো পক্ষ নয়। যেহেতু খাদ্য মন্ত্রণালয় কোনো পক্ষ নয়, তাই এ বিষয়ে কোনো অনুরোধ তারা পাঠাবে না। আইন সংশোধন করতে হলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় করবে। প্রসঙ্গত, ২০০৯ সালের ১ জুন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ বনাম বাংলাদেশ, রিট পিটিশন নং ৩২৪/২০০৯ মামলায় হাইকোর্ট সরকারকে দেশের প্রতিটি জেলা ও মহানগরে খাদ্য আদালত (ফুড কোর্ট) স্থাপন এবং খাদ্য বিশ্লেষক ও খাদ্য পরিদর্শক নিয়োগের আদেশ দিয়েছিলেন। এই রায় কার্যকরের জন্য আদালত সরকারকে দুই বছরের সময়সীমাও বেঁধে দিয়েছিল। কিন্তু চার বছর পর হতে চললেও এখন পর্যন্ত প্রতিটি জেলায় খাদ্য আদালত (ফুড কোর্ট) গঠিত হয়নি। ফলে ভোক্তারা খাদ্যে ভেজাল রোধে আইনের আশ্রয় নিতে এবং বিচারের দুয়ার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। উচ্চ আদালত একই রায়ে জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা উপদেষ্টা পরিষদ গঠনেরও আদেশ দিয়েছিলেন। আদালত তার রায়ে বলেছে, 'দেশের জনগণ অসুস্থ থাকিলে রাষ্ট্রের কোনো পরিকল্পনারই অগ্রগতি হইতে পারে না। এই সকল কারণে জনগণের সুস্বাস্থ্যের প্রতিবিধানকরণ প্রাধান্য পাইবার যোগ্য। কারণ ৩২ অনুচ্ছেদে ব্যক্তি জীবনের সুস্থতা ব্যতিরেকে প্রজাতন্ত্রের সকল প্রচেষ্টাই সম্পূর্ণ বিফল হইবে। অতঃএব সংবিধানে বর্ণিত উপরোক্ত উদ্দেশ্য পূরণকল্পে বিশুদ্ধ খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিতকরণ অতি জরুরি। এই সংক্রান্ত পদক্ষেপ বিশুদ্ধ খাদ্য অধ্যাদেশ ১৯৫৯-এ বর্ণনা করা হইয়াছে কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক এই যে ইহার কোনো প্রয়োগ দৃশ্যমান নহে। সরকারপক্ষ হইতেও এইরূপ ব্যর্থতা অস্বীকার করিতে পারে না।' নির্দেশ বাস্তবায়নে দেরি হওয়ায় বছরখানেক আগে আইন মন্ত্রণালয় আদালতে দুঃখ প্রকাশ করে। আদালতে জানানো হয়, আদালত প্রতিষ্ঠার একক এখতিয়ার তাদের নেই। তবে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং খাদ্য মন্ত্রণালয় সম্মতি দিলে প্রতি জেলায় বিশুদ্ধ খাদ্য আদালত প্রতিষ্ঠায় কোনো বাধা নেই। কিন্তু এরপরও দীর্ঘসময় পেরিয়ে গেলেও এ সমস্যার সমাধান হয়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইন্সটিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. আমিনুল হক ভুঁইয়া যায়যায়দিনকে বলেন, সরকারের 'নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩' একটি প্রশংসনীয় নীতিমালা। এ বিষয়ে একটি আইন প্রণয়ন করা প্রয়োজন। তবে সব আইন প্রয়োগের মাধ্যমে সফল হয়। যথাযথ বাস্তবায়ন আর গণসচেতনার মাধ্যমেই আইন পরিপূর্ণতা লাভ করে। কাস্টম মনিটরিংয়ের ওপরেও এর সফলতা অনেকটা নির্ভর করে। তিনি বলেন, আইন করে সেটি বাস্তবায়ন না করলে আইন কোনো কাজে আসবে না। আইনের যথাযথ কার্যকর জরুরি। এর আগে ২০০৯ সালে সরকার ভেজালবিরোধী খাদ্য আইন প্রণয়ন করেছিল। দেশের সকল জেলায় এটা বাস্তবায়ন করার কথা থাকলেও শুধুমাত্র ঢাকাতে চালু হয়। কিন্তু যথাযথ উদ্যোগের অভাবে সে আইন বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। ইন্সটিটিউটের প্রাক্তন মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. গোলাম মাওলা বলেন, ভেজালবিরোধী নিরাপদ খাদ্য আইন প্রণয়ন খুবই প্রয়োজন। বর্তমানে যে হারে খাদ্যে ভেজাল মেশানো হয় তাতে শারীরিক দিক থেকে মানুষ খুবই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তিনি বলেন, আজকাল মিষ্টিতে যে পরিমাণ ফরমালিন, কেমিক্যাল, কারবাইট, ফুডকালার জাতীয় ভেজাল দ্রব্য মেশানো হচ্ছে তাতে মিষ্টির প্লেটের পাশে একটা তেলাপোকা মরে থাকলে পিঁপড়া সেটা খেতে আসে, কিন্তু মিষ্টি খেতে আসে না। এজন্য আইন প্রণয়ন করলে খাদ্যে কোন ফরমালিন মেশানো দরকার এবং তা প্রয়োজন আছে কিনা সে ব্যাপারে ধারণা সৃষ্টি হবে। আর যদি তা জনগণের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে যারা এটা ব্যবহার করছে তাদের কঠোর হস্তে দমন করে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। যদি আইনের মাধ্যমে সেটা করা সম্ভব হয় তাহলেই আইন প্রণয়ন সফল হবে। আইন প্রণয়নের তোড়জোড় থাকলেও দেশের জেলায় জেলায় বিশুদ্ধ খাদ্য আদালত গঠনের ব্যাপারে সরকারের অনীহার নেপথ্যে নিঃসন্দেহে বিশেষ কোনো কারসাজি রয়েছে বলে অভিজ্ঞজনরা মন্তব্য করেছেন। এ ষড়যন্ত্রের সঙ্গে কারা জড়িত তাদের চিহ্নিত করে দেশকে রাহুগ্রাস থেকে মুক্ত করার জন্য তারা সরকারকে তাগিদ দিয়েছেন। মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচপিআরবি) সভাপতি আইনজীবী মনজিল মোরশেদ বলেন, 'আদালতের রায়ের দুই বছরের মধ্যে সরকারের প্রতিটি জেলা ও মহানগরে খাদ্য আদালত স্থাপনের কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত এ ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ না করে সরকার আদালতের নির্দেশ অমান্য করেছে। তাই আদালত অবমাননার দায়ে সরকারের বিরুদ্ধে মামলা করা দরকার।' খাদ্যে ভেজাল রোধ এবং খাদ্য উৎপাদন-বিপণন নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশে রয়েছে বিশুদ্ধ খাদ্য অধ্যাদেশ ১৯৫৯। ১৯৫৯ সালের বাংলাদেশ বিশুদ্ধ খাদ্য অধ্যাদেশ আইনটির সংশোধনী আনা হয় ২০০৫ সালে। এ অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, সরকার যেকোনো এলাকায় খাদ্য পরিদর্শক নিয়োগ দেবে। আর এই খাদ্য পরিদর্শক খাদ্য-সংশ্লিষ্ট যেকোনো প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন, ভেজাল খাদ্যদ্রব্য জব্দ, ধ্বংসসহ অধ্যাদেশে বর্ণিত যেকোনো ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবেন। বাংলাদেশের প্রতিটি জেলা ও মহানগরে খাদ্যে ভেজাল রোধে এক বা একাধিক খাদ্য আদালত থাকবে। সরকার গেজেট নোটিফিকেশনের মাধ্যমে এসব আদালত প্রতিষ্ঠা করবে এবং প্রতিটি আদালতের ভৌগোলিক এখতিয়ার নির্ধারণ করবে। প্রতিটি খাদ্য আদালতে বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্বে থাকবেন একজন প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট। এ ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধিতে বর্ণিত বিচারিক পদ্ধতি অনুসরণ করা হবে।
এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আপনার মতামত দিতে এখানে ক্লিক করুন |
প্রথম পাতা -এর আরো সংবাদ
সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
সর্বাধিক মতামত
অনলাইন জরিপ
অনলাইন জরিপআজকের প্রশ্ননির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে সংলাপের আয়োজনে বিএনপির অনুরোধে সরকার সাড়া দেবে
বলে কি মনে করেন?হ্যাঁনাজরিপের ফলাফল |