রোববার, মে, ১৯, ২০১৩: জ্যৈষ্ঠ ৫, ১৪২০ বঙ্গাব্দ: ৮ রজব , ১৪৩৪ হিজরি, ০৭ বছর, সংখ্যা ৩৩৬ |
| গুগল ওয়েব অনুসন্ধান | অনুসন্ধান |
|
মহাসেনের হানায় উপকূলের
লক্ষাধিক বাড়িঘর বিধ্বস্তবরগুনায় দিশাহারা কৃষকের ঘুম নেইযাযাদি ডেস্ক ঘূর্ণিঝড় মহাসেনের হানায় দেশের উপকূলীয় ১০টি জেলায় ১ লাখেরও বেশি ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। মহাসেনের আশঙ্কায় সরকার উপকূলের ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল থেকে অন্তত ১২ লাখ মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়। বিবিসি বাংলা।ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো থেকে অনেকে অভিযোগ করছেন, ঘরবাড়ি হারিয়ে তারা দুর্ভোগের মধ্যে রয়েছেন। গাছপালা, ফসল এবং চাষ করা মাছের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এই ঘূর্ণিঝড়ে এ পর্যন্ত ১৭ জন নিহত হওয়ার খবর নিশ্চিত করেছে প্রশাসন। এছাড়াও সরকার বলছে, ঝড়ের বিপদ কেটে যাওয়ায় আশ্রয়কেন্দ্র থেকে মানুষ এখন তাদের বাড়িঘরে ফিরে গেছেন। এদিকে মহাসেনের ছোবলে আউশ, বোরো ও রবিশস্যের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হওয়ায় দিশাহারা হয়ে পড়েছেন বরগুনার কৃষক। এখন দুঃসময় মেঘনার মোহনায় ভোলার চরকুকরিমুকড়িতে প্রায় ২৫ হাজার লোকের বাস। মূল ভূখ- থেকে বিচ্ছিন্ন এই চরে ঘূর্ণিঝড়ে ঘরবাড়ি হারিয়ে অনেক মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েছেন। সেই চরকুকরিমুকড়িতে ঝড়ে বিধ্বস্ত ঘরেই বাস করছেন মো. আব্দুল্লাহ। তিনি বলেছেন, 'আমাদের এখন দুঃসময়। ঝড়ে ভাঙা ঘরেই কোনোভাবে পরিবার নিয়ে আছি।' চরকুকরিমুকড়ির আরেক বাসিন্দা মো. হাবিবউল্লাহ বলছিলেন, 'অনেক মানুষ পলিথিন টানিয়ে তার নিচে রাত কাটাচ্ছেন। অনেকে এখনো ইউনিয়ন পরিষদ ভবন এবং আশ্রয়কেন্দ্রে রয়ে গেছেন।' পটুয়াখালীর খেপুপাড়া এলাকায় ঘূর্ণিঝড় প্রথম আঘাত হেনেছিল। সেখানে ধনজুপাড়া নামের একটি গ্রামের সব কৃষক মিলে সমিতি করে ৪০ একর জমিতে সূর্যমুখী ফুলের চাষ করেছিলেন। তাদের একজন হারুন তালুকদার বলেছেন, সূর্যমুখী ফুলের ক্ষেত এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। পটুয়াখালী অঞ্চলে চাষ করা মাছেরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। খেপুপাড়ার একটি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল মালেক আকন্দ বলেছেন, তার ইউনিয়নেই ১৩টি গ্রামের সব পুকুর এবং মাছের পোনার ঘের এখনো পানির নিচে। তবে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আব্দুল ওয়াজেদ জানিয়েছেন, এবারের ঘূর্ণিঝড়ে উপকূলের ১০টি জেলায় ঘরবাড়ির বেশি ক্ষতি হয়েছে। প্রাথমিক পরিসংখ্যানে তিনি দেখেছেন, সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়েছে, এমন বাড়িঘড়ের সংখ্যা ৪৯ হাজার ১৭৮টি। আর আংশিক বিধ্বস্ত বাড়িঘড় হচ্ছে ৪৫ হাজার ৮২৫টি। তিনি বলেছেন, উপকূলীয় জেলাগুলোয় আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে ১২ লাখের মতো মানুষ আশ্রয় নিয়েছিলেন। তাদের সবাই নিজ নিজ বাড়িঘরে ফিরে গেছেন। সে কারণে সরকার ধারণা করছে, বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হলেও মানুষ একেবারে গৃহহীন হয়ে পড়েনি। তিনি উল্লেখ করেছেন, গাছপালা, ফসল বা অন্যান্য ক্ষয়ক্ষতির পরিসংখ্যান পেতে আরো সময় প্রয়োজন। সরকার এটাও বলেছে, যাদের বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাদের এখন স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে ২০ কেজি করে চাল এবং তিন হাজার টাকা দেয়া হচ্ছে। বরগুনায় ক্ষতিগ্রস্ত ৫ লাখ মানুষ এদিকে বরগুনা প্রতিনিধি জানান, মহাসেনের তা-বে জেলার ৫ লাখ ১৯ হাজার লোক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এক লাখ ১৭ হাজার ৩০০ মানুষ। ঘূর্ণিঝড় মহাসেন আঘাত হানার তিনদিন পর শনিবার ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ তালিকা চূড়ান্ত করেছে জেলা প্রশাসন। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, মহাসেনের আঘাতে জেলায় ৬ হাজার ৮৫৬টি বসতঘর সম্পূর্ণ ও ৬১ হাজার ৮১২টি বসতঘর আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে জেলায় ৫ লাখ ১৮ হাজার ৬৯০ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এছাড়া ১৩২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ ও ৩৫৭টি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ক্ষতি হয়েছে ১৪৬ কিলোমিটার। ঘূর্ণিঝড়ে ১৯০ কিলোমিটার কাঁচা সড়ক সম্পূর্ণ ও ৮৮৫ কিলোমিটার আংশিক এবং ১৯৫ কিলোমিটার পাকা সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের সম্পূর্ণ ক্ষতি হয় ১০৭ কিলোমিটার এবং আংশিক ক্ষতি হয় ১৭৮ কিলোমিটার। এছাড়া ১৩ হাজার ৬২৭টি মাছের ঘের ও পুকুর, ৫১৪টি মাছ ধরা নৌকা ও ট্রলার, ১৯৬টি নলকূপ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জেলায় ৪৫ হাজার হেক্টর জমির রোরো, আউশ ও রবি ফসল সম্পূর্ণ ও ৩০ হাজার ৪৬৮ একর জমির ফসল আংশিক ক্ষতি হয়। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা প্রকাশ চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, মাঠপর্যায়ের তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে ক্ষয়ক্ষতির এই তালিকা প্রণয়ন করা হয়েছে। ত্রাণ তৎপরতা অপ্রতুল বরগুনায় ক্ষতিগ্রস্তদের ত্রাণ তৎপরতার অপ্রতুলতায় অনেক পরিবার এখনো অনাহারে আছেন। শুক্রবার বিকালে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে সীমিত আকারে কিছু ত্রাণ তৎপরতা শুরু করা হয়েছে। তবে সেটা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল। জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ৪২টি ইউনিয়নে শুক্রবার ৬৬ মেট্রিক টন ও শনিবার ৫৮ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এছাড়া ৪ লাখ টাকার শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে। নিহত সাত জনের পরিবারের প্রত্যেককে ২০ হাজার টাকা করে সহায়তা দেয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন ইউনিয়নের বেশ কয়েকজন চেয়ারম্যান ও ইউপি সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সরকারের পক্ষ থেকে শুক্রবার বিকালে ৬৬ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। শনিবার আরো ৫৮ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেয়া হয়। কিন্তু তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল। জেলায় প্রায় দুই থেকে আড়াই লাখ পরিবার এই ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সে অনুপাতে ত্রাণ তৎপরতা খুবই সীমিত। জেলা প্রশাসক মো. আবদুল ওয়াহাব ভূঞা বলেন, 'প্রাথমিকভাবে চাল বিতরণ করে সাময়িক পরিস্থিতি সামাল দেয়া হচ্ছে। তবে এই সহায়তা অব্যাহত থাকবে এবং ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ তালিকা তারা ঢাকায় পাঠিয়েছেন। এরপর সামগ্রিক বিষয় বিবেচনায় এনে ব্যবস্থা নেয়া হবে। বরগুনায় দিশাহারা কৃষক এদিকে, ঘূর্ণিঝড় মহাসেনের আঘাতে আউশ-বোরো ও রবিশস্য ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দিশাহারা কৃষক। বেশিরভাগ কৃষক ধারদেনা ও ঋণ করে ফসল আবাদ করেন। ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তাদের ওপর চেপেছে ঋণের বোঝা। মহাসেনের প্রভাবে তুমুল বৃষ্টি ও জলোচ্ছ্বাসে বেশিরভাগ ফসলের ক্ষেত নিমজ্জিত হওয়ায় জেলার প্রায় ৪৫ হাজার একর জমির ফসল সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জেলা ত্রাণ ও পনর্বাসন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে। কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ কর্মকর্তা বলেছেন, পানি নেমে গেলেই ক্ষয়ক্ষতির সঠিক পরিমাণ নিরূপণ সম্ভব হবে। বরগুনা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ জানায়, জেলায় এবার বোরো, আউশ বীজতলা এবং রবিশস্য আবাদ করা হয়েছে ৩০ হাজার ৬৩৯ হেক্টর জমিতে। মহাসেনের প্রভাবে তুমুল বৃষ্টি ও জলোচ্ছ্বাসে ফসলি জমি তলিয়ে যায়। বন্যায় সম্পূর্ণ ক্ষতি হয় প্রায় ৪৫ হাজার একর জমির বোরো-আউশ ও রবিশস্য। আংশিক ক্ষতি হয় ৩০ হাজার ৪৬৮ একর জমির ফসল। এর মধ্যে ৪৩৩ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ করা হয়। সম্পূর্ণ ক্ষতি হয় ১৮০ হেক্টর জমির বোরো ধান। আউশ বীজতলা আবাদ করা হয় ৩ হাজার ১২৫ হেক্টর জমিতে। এখনো তলিয়ে আছে ১ হাজার ৫০০ হেক্টর আউশ বীজতলা। আউশ ধান আবাদ করা হয় ৮ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে। এখনো ৫ হাজার হেক্টর জমির আউশ ধান পানির নিচে রয়েছে। মুগ ডাল আবাদ করা হয় ১১ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে। তলিয়ে আছে ৬ হাজার হেক্টর জমিতে। মরিচ আবাদ করা হয়েছে ১ হাজার ৮০০ হেক্টর জমিতে। আক্রান্ত হয় ১ হাজার হেক্টর জমির মরিচ। শনিবার বরগুনা সদরের নলটোলা ইউনিয়নে গিয়ে দেখা যায় কয়েক হাজার হেক্টর জমির ফসল পানির নিচে তলিয়ে আছে। এখন কী করবেন তা তারা বুঝে উঠে পারছেন না। বরগুনা সদরের নলটোনা গ্রামের খলিলুর রহমান বলেন, ধারদেনা করেই বোরো ধানের চাষ করেছেন। 'বন্যাই মোর সব শ্যাষ কইরা দিল।' নলটোনা ইউনিয়নের গাজী মাহমুদ, গর্জনবুনিয়া, আগা পদ্মা, গোড়া পদ্মা, ছোনবুনিয়া, সোনাতলা, বালিয়াতলী ইউনিয়নের পাতাকাটা, পালের বালিয়াতলী, ছোট তালতলী; ছোট বদরখালী গৌরিচন্না ইউনিয়নের খাজুরতলা, লাকুরতলা, বেতবুনিয়া, বাইশতবক, তালতলী উপজেলার বগী, লাউপাড়া, নিশানবাড়িয়া, সোনাতলা, বড়ভাইজোড়া, তালতলী পাড়া, আমতলী উজেলার পচাকোড়ালিয়া গুলিশাখালি, কচুপাত্রা, চাউলাপাড়া, তালুকদারের হাট, কুকুয়া, মহিষকাটা এসব গ্রামের কয়েক হাজার একর ফসলি জমি পানিতে নিমজ্জিত হয়ে আছে। বরগুনা সদরের গৌরিচন্না ইউনিয়নের খাজুরতলা গ্রামের মাসুদ হাওলাদার বলেন, আউশ ধান রোপণ করেছেন। তা বন্যাই শেষ করে দিল। 'কিভাবে কী করমু তা বুঝে উঠে পারছি না।' তালতলী উপজেলার ছাতনপাড়া গ্রামের মাহামুদ বলেন, 'ব্যাংক দিয়া ২৫ হাজার টাকার লোন নিয়ে রবি ও বোরো চাষ করছিলাম। হেইয়্যা সব শেষ। কী দিয়া সংসার চালামু, কী দিয়া লোন দিমু ভাইবা কোল পাই না।' একই গ্রামে রাশু তালুকদার, হাসিনা আনছার, আলতাফ জানান, বিভিন্ন ব্যাংক থেকে তারা ঋণ নিয়েছেন। তা দিয়ে বোরো ও রবিশস্য চাষ করেছিলেন। এবারের বন্যা সব শেষ করে দিয়েছে। কিভাবে তা পরিশোধ করবেন, এ নিয়ে তারা চিন্তিত হয়ে পড়েছেন। বরগুনা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপপরিচালক লুৎফর রহমান বলেন, বন্যায় প্রায় ৫০ কোটি টাকার বোরো-আউশ ও রবিশস্যের ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে। এর মধ্যে সম্পূর্ণ ক্ষতি হয়েছে মিষ্টি আলু, মুগ ডাল, তিল, চীনা বাদাম, মরিচ, গ্রীষ্মকালীন সবজি, বোরো ও আউশ ধানের ক্ষেত।
এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আপনার মতামত দিতে এখানে ক্লিক করুন |
শেষের পাতা -এর আরো সংবাদ
সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
সর্বাধিক মতামত
অনলাইন জরিপ
অনলাইন জরিপআজকের প্রশ্নবিএনপি সংসদ অধিবেশনে যোগ দিলে দেশের চলমান রাজনৈতিক সঙ্কট কাটবে বলে কি
মনে করেন?হ্যাঁনাজরিপের ফলাফল |