মতামত :
¦
¦
পুলিশের দায়মুক্তি দায়সারা তদন্তেআইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে নির্যাতন থেমে নেই। অবর্ণনীয় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনে প্রচলিত আইন ও মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে বারবারদেব দুলাল মিত্র আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে নির্যাতন থেমে নেই। অবর্ণনীয় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনে প্রচলিত আইন ও মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে বারবার। কোনো কোনো নারীবন্দির ক্ষেত্রে এ নির্যাতনের ভয়াবহতা আরো ব্যাপক। যারা নির্যাতন করছে তাদের সাজার ব্যাপারে সরকার বা পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। দায়সারাভাবে তদন্ত শেষ করে দোষী ব্যক্তিকে অন্যত্র বদলি করে দায়মুক্তি দেয়া হয়।
জানা গেছে, পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যুর ঘটনায় বিভিন্ন সময়ে মন্ত্রী, রাজনৈতিক ব্যক্তি, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, পদস্থ পুলিশ কর্মকর্তা ও দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংগঠনগুলো সোচ্চার হলেও বাস্তবে এখনো হেফাজতে নির্যাতন অব্যাহত রয়েছে। কখনো কখনো মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে। এসব নির্যাতনের বিষয়গুলো এখনো সভা, সেমিনার ও টকশোতেই সীমাবদ্ধ। বিভিন্ন সময়ে সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘিত ও আইনের অপপ্রয়োগ করা হচ্ছে। রাষ্ট্রযন্ত্রের বিভিন্ন দপ্তরের বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যারা আইন ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তারা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জনগণের মৌলিক অধিকারের কথা ভুলে যান। ফলে ন্যায়বিচার অনেক ক্ষেত্রে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
এ ব্যাপারে অবশ্য আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকার যায়যায়দিনকে বলেন, পুলিশ একটি প্রশিক্ষিত বাহিনী। আইন অনুযায়ী তাদের দায়িত্ব পালন করতে হয়। বিধিবহির্ভূত কর্মকা- কোনোভাবেই মেনে নেয়া হয় না। এটা হলেই আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হয়। শুরু থেকেই একজন সদস্যকে মানবাধিকার ও বন্দির প্রতি আচরণের ব্যাপারে বিভিন্ন ধাপে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। এটা একটা চলমান প্রক্রিয়া। কিন্তু তারপরও বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ঘটছে। তবে এ জন্য পুরো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দোষী বলা যাবে না। মুষ্টিমেয় কিছু সদস্য নির্যাতন ও বিধিবহির্ভূত কাজ করে। আইজিপি বলেন, হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যুর অভিযোগ পাওয়া মাত্র প্রতিটি ঘটনার তদন্ত করা হচ্ছে। অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া মাত্র দোষী পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
পুলিশ বাহিনীকে একটি আধুনিক বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা অব্যাহত থাকার পরও সদস্যদের কার্যক্রম ও আচরণে বিশেষ কোনো পরিবর্তন এখনো আসেনি। পেশাগত কার্যক্রমে মান্ধাতা আমলের আইনে কিছু কিছু পরিবর্তন করা হলেও প্রকৃতপক্ষে আগের 'ধ্যান-ধারণা' এখনো বহাল রয়েছে। মানবাধিকার ও নাগরিক অধিকার সুরক্ষার ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যক্রম ও আচরণের আমূল কোনো পরিবর্তন হয়নি।
মানবাধিকার সংগঠন 'অধিকার' এর তথ্য সূত্রে জানা গেছে, কুষ্টিয়া জেলার দৌলতপুর থানা পুলিশ মোসাম্মৎ রোজিনা খাতুন (৪২) নামে এক মহিলাকে থানা হাজতে আটকে রেখে শারীরিক নির্যাতন ও যৌন হয়রানি করেছে। গত বছরের ১ অক্টোবর রোজিনা খাতুন ও রিক্তা খাতুন নামে দুই মহিলাকে ফেনসিডিলসহ দৌলতপুর থানা পুলিশ গ্রেপ্তার করে। পরে রিক্তা খাতুনের পরিবারের লোকজন পুলিশকে টাকা দিলে পুলিশ তাকে আদালতে চালান করে দেয়। কিন্তু রোজিনার কাছ থেকে টাকা না পাওয়ায় তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডে নেয়। গত ৪ অক্টোবর রোজিনা রিমান্ডে থাকা অবস্থায় থানার এক সাব-ইন্সপেক্টর তাকে শারীরিক নির্যাতন ও যৌন হয়রানি করে।
কুষ্টিয়া জেলা কারাগারের গেটে রোজিনা খাতুন 'অধিকার' এর কাছে অভিযোগ করেন, ৪ অক্টোবর দুপুর সাড়ে ৩টার দিকে সাব-ইন্সপেক্টর জয়গোপাল বিশ্বাস জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রোজীনাকে কুষ্টিয়া জেলা কারাগার থেকে দৌলতপুর থানায় নিয়ে যান। তাকে একটি রুমে বসিয়ে রাখা হয়। সন্ধ্যার পর জয়গোপাল ওই কক্ষে গিয়ে রোজীনাকে জিজ্ঞাসা করেন, তার সঙ্গে আর কে কে মাদক পাচারের কাজ করে? এ ব্যাপারে কিছু জানেন না বলার সঙ্গে সঙ্গে সাব-ইন্সপেক্টর রোজীনা খাতুনকে মারধর শুরু করেন এবং শরীর থেকে কাপড় খুলে ফেলেন। রোজীনা কান্নাকাটি শুরু করলে সাব-ইন্সপেক্টর রুম থেকে বের হয়ে যান। আধ ঘণ্টা পর তিনি ফিরে এসে রোজীনার চোখ বেঁধে অন্য একটি স্থানে নিয়ে যান। এরপর তাকে যৌন হয়রানি করা হয়। রোজিনা জানান, সে রাতে তার ওপর যত রকম শারীরিক নির্যাতন করা সম্ভব, তার সবই সে চর্চা করেছে।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৩(২) অনুচ্ছেদে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, 'গ্রেপ্তারকৃত ও প্রহরায় আটক প্রত্যেক ব্যক্তিকে নিকটতম ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ম্যাজিস্ট্র্রেটের সম্মুখে হাজির করতে হবে এবং ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশ ছাড়া কাউকে তার অতিরিক্ত সময় প্রহরায় আটক রাখা যাবে না।' কিন্তু এই নিয়ম সংবিধানেই সীমাবদ্ধ প্রায়। অনেক ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা এই নিয়মের কোনো তোয়াক্কা করেন না। গ্রেপ্তার বা আটকের পরও স্বীকার করেন না। বেশ কয়েকদিন পর পুলিশ গ্রেপ্তারের কথা স্বীকার করেন। গ্রেপ্তারের দিনক্ষণের সঙ্গে ভুক্তভোগীর পরিবার ও পুলিশের বক্তব্যের কোনো মিল থাকে না। এর জলন্ত উদাহরণ হলো সাম্প্রতিক সময়ে সাভারে পুলিশ হেফাজতে নির্যাতনের ফলে ব্যবসায়ী শামীম সরকারের নির্মম মৃত্যু। গত ৫ জুন সন্ধ্যায় শামীমকে আটকের পর ৫ লাখ টাকা চাঁদা চায় পুলিশ। টাকা আদায়ের জন্য সাভারের হরিণধরা পুলিশ ফাঁড়িতে আটকে রেখে নির্মম নির্যাতন চালায় ৫ পুলিশ সদস্য। এতে শামীমের পরিণতি হয় মৃত্যু।
সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যার ঘটনায় সন্দেহভাজন হিসেবে তানভীর রহমান নামে এক ব্যক্তিকে গত বছরের ১ অক্টোবর উত্তরা এলাকার বাসা থেকে বের হওয়ার পর সাদা পোশাকের পুলিশ তাকে আটক করে। ৯ দিন আটক রাখার পর আদালতে হাজির করা হয়। তানভীর রহমানের বাবা মাহাবুবুর রহমানের অভিযোগ তানভীরকে খুঁজে না পাওয়ায় পরিবারের সদস্যরা পুলিশ এবং র‌্যাবের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কিন্তু তারা তানভীরকে আটকের বিষয়টি অস্বীকার করেন। তিনি এ ব্যাপারে উত্তরা (পশ্চিম) থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। পরে ৯ অক্টোবর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, সাগর-রুনি হত্যা মামলায় তানভীর রহমান নামে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ৯ দিন অজ্ঞাত স্থানে রাখার পরে তানভীরকে আদালতে হাজির করা হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী না বললে হয়তো তানভীরকে আরো অনেক দিন অজ্ঞাত স্থানে আটকে রাখা হতো। সংবিধান ও আইন লঙ্ঘন করেই তানভীরকে আটকে রাখা হয়। কিন্তু এ জন্য দায়ী পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।
বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী সব নাগরিকের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব। সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সব নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী। সংবিধানের ৩৫ (৫) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, 'কোনো ব্যক্তিকে যন্ত্রণা দেয়া যাইবে না কিংবা নিষ্ঠুর, অমানুষিক বা লাঞ্ছনাকর দ- দেওয়া যাইবে না কিংবা কাহারও সহিত অনুরূপ ব্যবহার করা যাইবে না।' কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে মৃত্যু ও নির্যাতন একটি গুরুতর অপরাধ হলেও সরকারের পক্ষ থেকে এ নির্যাতন বন্ধে কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হয়নি।
গত ৯ জুন রোববার গভীর রাতে রাজধানীর রমনা রেস্তোরাঁর সামনের রাস্তায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সঙ্গে কথিত ক্রসফয়ারে নিহত হয় জাকির হোসেন রাজু। ডিবির দাবি রাজু ছিনতাইকারী চক্রের সদস্য। কিন্তু ঘটনার সময় প্রায় ৫০ রাউন্ড গুলি বিনিময়ের কথা মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হলেও বাস্তবে এর কোনো সত্যতা খুঁজে পাওয়া যায়নি। এমনকি মামলার সাক্ষীরা পর্যন্ত অস্ত্র উদ্ধার ও রাজুকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করতেও দেখেনি। ওদিকে রাজুর স্ত্রী সুমির দাবি, ৬ জুন শুক্রবার শামীম নামে রাজুর এক বন্ধু গ্রামের বাড়ি বরিশাল থেকে শামীমকে নিয়ে ঢাকায় আসেন। পরের দিন শনিবার থেকে রাজুর মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। শামীম ওই দিনই তাকে পরিকল্পিতভাবে ডিবির হাতে তুলে দেয়। ডিবির হেফাজতে থাকা অবস্থায় পরের দিন রোববার গভীর রাতে রাজুকে হত্যা করা হয়।
আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে, এই মামলায় যে দু'জনকে ডিবি সাক্ষী করেছে তারা কেউ ঘটনার ব্যাপারে কিছুই জানেন না। অর্থাৎ ডিবি হেফাজতে থাকা অবস্থায় রাজুকে হত্যার পর ভয় দেখিয়ে সাক্ষী করা হয়েছে। অপরাধী হলেও তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগ দেয়া হয়নি। এদের মতো বহু মানুষকে একই পরিণতি বরণ করতে হয়েছে।
 
এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আপনার মতামত দিতে এখানে ক্লিক করুন
প্রথম পাতা -এর আরো সংবাদ
অনলাইন জরিপ
অনলাইন জরিপআজকের প্রশ্নগ্রামীণ ব্যাংক ভেঙে ১৯ টুকরা করার সরকারি সুপারিশ আদৌ গ্রহণযোগ্য ও বাস্তবসম্মত বলে মনে করেন কি?হ্যাঁনাজরিপের ফলাফল
আজকের ভিউ
পুরোনো সংখ্যা
2010 The Jaijaidin