বুধবার, জুন, ১৯, ২০১৩: আষাড় ০৫, ১৪২০ বঙ্গাব্দ: ৯ শাবান, ১৪৩৪ হিজরি, ০৮ বছর, সংখ্যা ১৪ |
| গুগল ওয়েব অনুসন্ধান | অনুসন্ধান |
|
বিদায় আতিকুল হক চৌধুরীযাযাদি রিপোর্ট ![]() খ্যাতিমান নাট্যকার আতিকুল হক চৌধুরীর মরদেহ মঙ্গলবার শহীদ মিনারে নিয়ে এলে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সর্বস্তরের মানুষ তার কফিনে ফুল দিয়ে শেষ শ্রদ্ধা জানান _যাযাদি'তখন কে বলে গো সেই প্রভাতে নেই আমি/সকল খেলায় করবে খেলা এই আমি/নতুন নামে ডাকবে মোরে,/বাঁধবে নতুন বাহু-ডোরে'_ কবিগুরুর এই কথাগুলোর মতোই সবাইকে নতুন বাহুডোরে বেঁধে চিরবিদায় নিলেন দেশবরেণ্য নাট্যকার ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব আতিকুল হক চৌধুরী। মঙ্গলবার পড়ন্ত অপরাহ্নের আলোর কিরণের মাঝে মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে অন্তিম শয়ানে শায়িত করা হয় টেলিভিশন নাটকের এই আলোকবর্তিকাকে। এর আগে সর্বশেষ কর্মস্থল একুশে টেলিভিশন, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার ও দীর্ঘ প্রায় চলি্লশ বছরের কর্মক্ষেত্র বাংলাদেশ টেলিভিশন চত্বরে সর্বস্তরের মানুষ অশ্রুসিক্ত শ্রদ্ধায় শেষ বিদায় জানান গুণী এই নির্মাতাকে। ইটিভি ও বিটিভির সামনে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে তিন দফা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।সোমবার রাত পৌনে ১০টায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাজধানীর একটি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন আতিকুল হক চৌধুরী। রাতে হাসপাতালের মর্গে রাখা হয় তার মরদেহ। সেখান থেকে মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে তার নিথর দেহ শেষবারের মতো কলবাগানের নিজ বাসভবনে নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময় স্ত্রী জোহরা বেগম লিলি, একমাত্র ছেলে এনামুল হক চৌধুরীসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। মরদেহ ঘরে পেঁৗচ্ছানো মাত্রই তাদের কান্নাজড়িত বিলাপে পুরো বাসার পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। তাদের সঙ্গে প্রতিবেশীরাও কান্নায় ভেঙে পড়েন। সকাল ১০টার দিকে আতিকুল হক চৌধুরীর সর্বশেষ কর্মস্থল একুশে টেলিভিশন-ইটিভির সামনে তার মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি আমৃত্যু চ্যানেলটির উপদেষ্টা পদে আসীন ছিলেন। সেখানে ইটিভির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আশরাফুল আলমের নেতৃত্বে সর্বস্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী-সাংবাদিকরা প্রিয় এই মানুষটির প্রতি নিজেদের শেষ শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করেন। এ সময় আতিকুল হকের ছেলে এনামুল হক চৌধুরী এবং অভিনেতা আবুল কাশেম ও কাওসার চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন। সেখানে সকাল পৌনে ১১টায় তার প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। সকাল ১১টায় আতিকুল হক চৌধুরী পরিবারের সদস্য ও গুণগ্রাহীদের কাঁধে চড়ে শেষবারের মতো উপস্থিত হন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে। সেখানে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট আয়োজন করে নাগরিক শ্রদ্ধানুষ্ঠানের। বরাবরের মতো গুণী এই ব্যক্তিত্বের মরদেহ রাখা হয় শহীদ মিনারের গগনশিরীষ গাছের ছায়াতলে। সেখানে মন্ত্রিসভার সদস্য, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন ও সংস্কৃতি অঙ্গনের বিশিষ্টজনদের পাশাপাশি পুষ্পার্ঘ্য নিবেদন করেন সর্বস্তরের মানুষ। আতিকুল হকের মরদেহের প্রতি সর্বপ্রথমে পুষ্পার্ঘ্য নিবেদন করেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। এরপর একে একে পুষ্পার্ঘ্য নিবেদন করেন এমিরেটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, শিল্পী মুস্তফা মনোয়ার, নাট্যব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার, মামুনুর রশীদ, গণসঙ্গীত শিল্পী ফকির আলমগীর, বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের সভাপতি আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক আবদুল মান্নান চৌধুরী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, বিএনপির পক্ষে চেয়ারপারসনের উপাদেষ্টা ডা. এ জেড এম জাহিদুল ইসলাম ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক গাজী মাজহারুল ইসলাম, নির্মাতা মোরশেদুল ইসলাম, রওনক হাসান, ঋষিজ শিল্পীগোষ্ঠী, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, ছায়ানট, স্বাধীনতা শিক্ষক পরিষদ, টেলিভিশন প্রোগ্রাম প্রোডিউসার অ্যাসোসিয়েশন, শংকর সাঁওজাল, কারক নাট্য সম্প্রদায়, প্রাচ্যনাট, আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদ, জাসদ, বাসদ, বাকশিল্পী শফি কামাল, শ্রমিক-কৃষক-সমাজবাদী দল, বাংলা একাডেমী, কথাশিল্পী শওকত আলী, নাট্যজন আতাউর রহমান, আবদুল আজিজ, চ্যানেল আই, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য আফসার আহমেদ, ঢাকা পদাতিক, নাট্যকেন্দ্র, ডিরেক্টরস গিল্ড, আরটিভি, এনটিভি, দেশটিভি, নৃত্যশিল্পী সংস্থাসহ বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠন। শহীদ মিনারের বেদিতে পুষ্পার্ঘ্য নিবেদন শেষে এমিরেটাস অধ্যাপাক ড. আনিসুজ্জামান বলেন, 'ষাটের দশকে যখন তিনি বেতারে কাজ করতেন তখন থেকেই তার নাটকের সঙ্গে আমি পরিচিত ছিলাম। আতিকুল হক চৌধুরী টেলিভিশন নাটকে ভিত্তিভূমি গড়ে দিয়েছিলেন।' বন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, 'নাটক নিয়েই ছিল আতিকুল হক চৌধুরীর পথচলা। তিনি মূল্যবোধের জাগরণকে সামনে রেখে নাটক নির্মাণ করতেন। নতুনদের উৎসাহ দিয়ে নাটকে নিয়ে আসতেন। এত উৎকর্ষ সাধনের জন্যই জাতি তাকে আজীবন স্মরণ করবে।' ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইনস্টিটিউট- আইটিআইয়ের বিশ্ব সভাপতি রামেন্দু মজুমদার বলেন, 'বাংলাদেশের টেলিভিশন নাটকে একটি বিকল্পধারার প্রবর্তন করেছিলেন আতিকুল হক চৌধুরী। তিনি প্রমাণ করেছিলেন নাটক শুধু বিনোদন নয় বরং এর মাধ্যমে জাতিকে সংগঠিত করা যায়। বর্তমান সময়ের অনেক শিল্পীই তার হাত ধরে উঠে এসেছেন। মুক্তিযুদ্ধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল আতিকুল হক সবসময় মানুষ ও সমাজের মঙ্গল কামনা করতেন।' বাংলাদেশ টেলিভিশনের দীর্ঘদিনের সহকর্মী শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার বলেন, 'সমাজের ঘাত-প্রতিঘাত তার অন্তর্দৃষ্টির মাধ্যমে নাটকে ফুটিয়ে তুলেছেন। তিনি নাটক লিখেছেন শৈল্পিক ও মূল্যবোধ থেকে, অকারণে নয়। যারা নতুন নাটক তৈরি করতে এসেছেন তিনি তাদের দিকনির্দেশনা দিয়ে সাহায্য করেছেন। বহু নতুন শিল্পীকে তিনি গড়ে তুলেছেন। তার মতো একজন শৈল্পিক সৃজনশীল মানুষ পৃথিবী থেকে চলে গেছেন। তার সৃষ্ট প্রতিভা যতদিন পৃথিবীতে থাকবে ততদিন মানুষ তাকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে।' দেশের সংস্কৃতি অঙ্গনের পক্ষে বক্তব্য রেখে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বলেন, 'আতিকুল হক চৌধুরী মহৎপ্রাণ মানুষ ছিলেন। তার নাটকের প্রতিটি শিল্পীকে তিনি যত্ন করে কাজ শিখিয়েছিলেন। তার নাটকের একটি নিজস্ব ধারা ছিল। বাঙালির উন্মেষকালের পথ ও মূল্যবোধ উঠে আসতো তার নাটকে। ব্যক্তি জীবনের মতোই শিল্পী জীবনেও তিনি ছিলেন সৎ। আদর্শে বিশ্বাসী মানুষ ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের পর আবদুল্লাহ আল মামুন ও তিনি টেলিভিশন নাটককে নতুন করে সাজিয়েছিলেন। তাকে বাদ দিয়ে দেশের টিভি নাটকের ইতিহাস ভাবা যায় না।' নাট্যজন মামুনুর রশীদ বলেন, 'তিনি তার সময়ে এক আলাদা জগৎ তৈরি করেছিলেন যা গড়ে উঠেছিল তার মূল্যবোধ আর মানবিকতাবোধ দিয়ে। তিনি সবার মধ্যেও বিশিষ্ট হয়ে উঠলেন তার সৃষ্টি নাটকের মাধ্যমে। আতিকুল হক মানেই তার নাটকে একটি বিশেষ ম্যাসেজ। পরিবার ও ভবিষ্যতের চিন্তা বাদ দিয়ে দিনের পর দিন তিনি নাটক লিখে গেছেন। যেসব নাটকে থাকতো মূল্যবোধ ও মানবিকতা বোধ। এর মধ্য দিয়েই তিনি আজীবন বেঁচে থাকবেন।' নাট্যজন আতাউর রহমান বলেন, 'তিনি ছিলেন একজন আদর্শবান নির্মাতা। আমার তার নাটকে অভিনয় করার সুযোগ হয়েছে। আর সেখানেই দেখেছি, শিল্পীদের প্রতি তার কি ধরনের ভালোবাসা।' তিনি বলেন, 'আতিকুল হক নানা বিষয়ের উপর নাটক নির্মাণ করেছেন। এমনকি তিনি রবীন্দ্রনাথের নাটক নিয়েও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। সব মিলিয়ে তিনি একজন নাট্যপ্রাণ মানুষ ছিলেন। তার কাজের মতো ব্যক্তিজীবনও পরিচ্ছন্ন। তিনি আমৃত্যু পরিপূর্ণ জীবন কাটিয়েছেন।' গণসঙ্গীত শিল্পী ফকির আলমগীর বলেন, 'তিনি খুবই মৃদভাষী, সৎ ও নিষ্ঠাবান মানুষ ছিলেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি আমার সংগঠন ঋষিজের অভিভাবক ছিলেন। নাট্যকার ও প্রযোজক সব পরিচয়কে ছাপিয়ে তিনি একজন সচেতন ও আদর্শবান মানুষ ছিলেন।' বাংলাদেশ টেলিভিশনের মহাপরিচালক ম হামিদ বলেন, 'তিনি সবসময় সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা নিয়ে কাজ করেছেন। একজন মানুষ কতটুকু নিষ্ঠার সঙ্গে সমাজকে উপলব্ধি করতে পারেন তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত আতিকুল হক চৌধুরী। তিনি স্বৈরাচার শাসনামলে স্বৈরাচারকে আক্রমণ করে নাটক বানিয়েছেন। কাজের জন্য বহুবার নিগৃহীত হওয়ার পরও তিনি তার কাজের ধরন বদল করেননি।' জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য আফসার আহমেদ বলেন, 'তিনি ১১ বছর ধরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগে শিক্ষকতা করে এটিকে সমৃদ্ধ করেছেন। তিনি জীবনে কখনো নেতিবাচক পথে হাঁটতেন না। তিনি চরম আশাবাদী মানুষ ছিলেন।' শহীদ মিনার থেকে তার মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ প্রাঙ্গণে। সেখানে বাদ জোহর তার দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় অংশ নেন নোবেলবিজয়ী অর্থনীতিবিদ মোহাম্মদ ইউনূস, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, কবি আসাদ চৌধুরী, ফরিদুর রেজা সাগরসহ সর্বস্তরের জনতা। সেখান থেকে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় দীর্ঘ প্রায় চলি্লশ বছরের কর্মস্থল বিটিভি চত্বরে। সেখানে তার প্রতি শ্রদ্ধা জানান বিটিভির সর্বস্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী। সেখান থেকে মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তৃতীয় জানাজা শেষে তাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়। আতিকুল হক চৌধুরী ১৯৩১ সালের ১৫ ডিসেম্বর ভোলার বাটামারা গ্রামে মামারবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তার নিজের পৈতৃক নিবাস বরিশালের উলানীয়া গ্রামে। ১৯৬০ সালে রেডিও পাকিস্তানে যোগ দেয়ার মাধ্যমে তিনি কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৬৬ সালে যোগ দেন বাংলাদেশ টেলিভিশনে। বিটিভিতে কর্মরত অবস্থায় দেশবাসীকে অসংখ্য সেরা নাটক উপহার দেন তিনি। সর্বশেষ তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশনের উপ-মহাপরিচালক ছিলেন। বিটিভির উপ-মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালীন ১৯৯০ সালে তিনি অবসরে যান। এরপর তিনি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল একুশে টেলিভিশনের উপদেষ্টা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এছাড়াও তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগেও ১১ বছর শিক্ষকতা করেছেন। বরেণ্য কর্মজীবনের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি শ্রেষ্ঠ নাট্য প্রযোজক হিসেবে ১৯৭৬ সালে জাতীয় টেলিভিশন পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়াও তিনি বাংলা একাডেমী পুরস্কার, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, বিটিভির সেরা প্রযোজকসহ অসংখ্য পুরস্কার পেয়েছেন।
এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আপনার মতামত দিতে এখানে ক্লিক করুন |
শেষের পাতা -এর আরো সংবাদ
সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
সর্বাধিক মতামত
অনলাইন জরিপ
অনলাইন জরিপআজকের প্রশ্নগ্রামীণ ব্যাংক ভেঙে ১৯ টুকরা
করার সরকারি সুপারিশ আদৌ গ্রহণযোগ্য ও বাস্তবসম্মত
বলে মনে করেন কি?হ্যাঁনাজরিপের ফলাফল |