পূর্ববর্তী সংবাদ
মতামত :
¦
¦
পুলিশ বক্স নিয়ে ডিসিসি ডিএমপি মুখোমুখিস্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাল্টাপাল্টি অভিযোগশফিকুল ইসলাম জুয়েল রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্টে পুলিশ বক্স স্থাপন করা নিয়ে ঢাকা সিটি করপোরেশন (ডিসিসি) এবং ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) এখন মুখোমুখি। পুলিশ বক্সের দোষ-গুণ নিয়ে দুপক্ষই দুই ধরণের যুক্তি-দাবি তুলে ধরছে। ডিসিসি চাচ্ছে সব পুলিশ বক্স সরিয়ে দিতে আর ডিএমপি বলছে আরো নতুন বক্স স্থাপন জরুরি। বিষয়টি নিয়ে দুপক্ষই নিজেদের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে।
ডিসিসি বলছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী পুলিশ রীতিমতো বিজ্ঞাপন বাণিজ্যে নেমেছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সড়ক দ্বীপ, ফুটপাত এবং চত্বর দখল করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ দেড়শতাধিক পুলিশ বক্স গড়ে তুলেছে। এগুলো বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে বিজ্ঞাপনের জন্য ভাড়া দেয়া হয়েছে। ফলে বছরে অন্তত ২০ কোটি টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে ডিসিসি। তবে পুলিশের দাবি, বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠান তাদের এসব বক্স তৈরি করে দিয়েছে। বিনিময়ে তারা তাদের প্রতিষ্ঠান বা পণ্যের প্রচারণার সামান্য সুযোগ নিচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মাইন উদ্দিন খন্দকার যায়যায়দিনকে বলেন, বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন কোম্পানির ব্যানারে স্থাপন করা পুলিশ বক্স নিয়ে ডিসিসি বিরক্ত। অন্যদিকে রাস্তায় দায়িত্ব পালনরত ডিএমপির পুলিশদের জন্য এটা খুব জরুরি। বিষয়টি নিয়ে দুপক্ষের সঙ্গে আলোচনার পর সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
ডিসিসির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, ডিএমপি পুলিশ বক্স তৈরির নামে যে বিজ্ঞাপন বাণিজ্য চালাচ্ছে, তার যথেষ্ট প্রমাণ তাদের হাতে রয়েছে। বেশিরভাগ পুলিশ বক্স নিজেরাই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে তৈরি করে যে বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে ভাড়া দিচ্ছে, তাও ধরা পড়েছে। ওই কর্মকর্তা জানান, কয়েক মাস আগে মতিঝিলের সোনালী ব্যাংকের সামনে একটি পুলিশ বক্সে ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন নাম্বার দিয়ে বিজ্ঞাপন আহ্বান করা হয়। ডিসিসির একজন কর্মকর্তা তার পরিচয় গোপন করে কল করলে রবি নামে এক ব্যক্তি জানান, তিনি এক্সপো নামের একটি প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তি। তার প্রতিষ্ঠান মতিঝিল ও গুলশান-২ নাম্বারে দুটি পুলিশ বক্স তৈরি করে দিয়েছে। এর আগে যে কোম্পানির বিজ্ঞাপন দেয়া হয়েছিল, তাদের সঙ্গে চুক্তি শেষ হয়ে যাওয়ায় নতুন করে বিজ্ঞাপন আহ্বান করা হয়েছে। রাজধানীতে এ ধরণের পুলিশ বক্সের সংখ্যাই বেশি বলে রবি দাবি করেছেন।
ডিসিসির দাবি, তারা সরেজমিন খোঁজ নিয়ে এর যথেষ্ট প্রমাণ পেলেও এ ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণের সাহস পায়নি। কেননা, তা হবে পুলিশের সঙ্গে ঘোষণা দিয়ে যুদ্ধে নামা। প্রাথমিক পর্যায়ে এ ধরণের উদ্যোগ নিয়ে তাদের বিপাকে পড়তে হয়েছে বলেও জানায় ডিসিসি। প্রসঙ্গত, গত বছর ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে এরকম ৮টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের চেষ্টা করা হলেও পুলিশি বাধায় তা অব্যাহত রাখা যায়নি।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ডিসিসির দেয়া আবেদনে বলা হয়েছে, রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ১০০টিরও বেশি পুলিশ বক্স স্থাপন হয়েছে। প্রতিদিনই আরো দু-একটি করে নতুন বক্স বসছে। এসব বক্স স্থাপনে ডিসিসির কোনো অনুমোদন নেয়া হচ্ছে না। অথচ বিভিন্ন কোম্পানি তাদের পণ্যের প্রসারে বিজ্ঞাপন সংবলিত ব্যানার দিয়ে এসব বক্স স্থাপন করে দিচ্ছে, যা স্থায়ী থাকছে দিনের পর দিন। এসব বক্স রাস্তার প্রাণকেন্দ্র ও সংযোগস্থলে হওয়ায় যানবাহন এবং মানুষের চলাচলে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে, যা সরিয়ে ফেলার কার্যকরী উদ্যোগ নিতে যানবাহন মালিকপক্ষ এবং সাধারণ জনগণ একাধিক আবেদন করেছেন।
অন্যদিকে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ডিএমপির দেয়া আবেদনে বলা হয়েছে, এসব বক্স খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং জরুরিও। রাজধানীর রাস্তার ট্রাফিক ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে যেসব পুলিশ সদস্য দায়িত্বপালন করেন, তাদের জন্য শান্তির ঢাল হিসেবে ব্যবহার হয় এসব বক্স। রোদ-বৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে দায়িত্ব পালন করা আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা এসব বক্সে সাময়িক বিশ্রাম করতে পারেন। অনেকে যত্নে রাখতে পারেন খাবার, ছাতা, পোশাকসহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। এছাড়া গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা বাস্তবায়নের প্রয়োজনে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও এ বক্সগুলোর নানা সুবিধা গ্রহণ করেন। সুতরাং প্রতিটি পয়েন্টেই পুলিশ বক্স স্থাপন অতীব গুরুত্বপূর্ণ।
তবে ডিএমপি এবং ডিসিসির প্রশাসন সূত্রের দাবি ভিন্ন। ডিএমপি বলছে- পুলিশ বক্স তৈরির কোম্পানিগুলো থেকে বিজ্ঞাপনের টাকা না পাওয়ায় পুলিশের ওপর নাখোশ ডিসিসি। অন্যদিকে ডিসিসি বলছে- শুধু বিজ্ঞাপন বিলের ক্ষতি নয়, এসব বক্সে নানা ধরনের অপ্রীতিকর কাজ হয় বলেও অভিযোগ আছে।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ডিসিসির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা তাজুল ইসলাম প্রধান যায়যায়দিনকে বলেন, পথচারী ও যানবাহন চালকদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তারা পুলিশ বক্সগুলো সরাতে বলেছেন। অবৈধভাবে স্থাপন করা পুলিশ বক্সের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানতে তারা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছেন।
ডিএমপির ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে যায়যায়দিনকে বলেন, পুলিশ বক্স সবসময় উন্মুক্ত থাকে। কখনোই কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে না। বক্সগুলো দায়িত্ব পালনরত পুলিশের জীবনের জন্য প্রয়োজন। বিষয়টি নিশ্চয়ই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা ভাববেন।
পুলিশের সাবেক আইজি নূরুল হুদা এ প্রসঙ্গে বলেন, সৌন্দর্য ও নিরাপত্তার বিষয়টি আমলে নিয়ে বিষয়টি শিগগিরই সমাধান করা উচিত। অবশ্য সিটি করপোরেশনের অনুমোদন না দিয়ে ডিএমপি অন্যায় করেছে। উপ-কমিশনার (মিডিয়া) মাসুদুর রহমান জানান, ট্রাফিক পুলিশ অনেক কষ্ট করে কাজ করে। এজন্য তাদের সামান্য বিশ্রামের জন্য বিভিন্ন সড়কের মোড়ে পুলিশ বক্স নির্মাণ করা হয়েছে। তবে সম্প্রতি এসব বক্স তৈরির জায়গা চেয়ে ডিসিসিকে চিঠি দেয়া হয়েছে। শিগগিরই এর সমাধান হবে।
বছর তিনেক আগে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ সদর দপ্তর থেকে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে দেড়শতাধিক পুলিশ বক্স স্থাপনের অনুমোদন দেয়া হয়। তৎকালীন উপ-কমিশনার (সদর) হাবিবুর রহমান এই অনুমোদন দেন। ওই অনুমোদনে অবশ্য এলাকার নাম উল্লেখ থাকলেও বুথ নির্মাণের জন্য নির্দিষ্ট করে জায়গার কথা উল্লেখ ছিল না। তাই সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক বিভাগের উপ-কমিশনাররা বুথগুলো নির্মাণের দায়িত্ব পাওয়া প্রতিষ্ঠানকে জায়গা নির্দিষ্ট করে দেন। তাদের নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতেই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো ফুটপাতের ওপর এই বুথগুলো নির্মাণ করেছে। আর প্যানাফ্লেক্সের তৈরি বিজ্ঞাপন দিয়ে বুথগুলোর কাচ ঢেকে দেয়া হয়েছে। আর এতে বাইরে থেকে ভেতরে বা ভেতর থেকে বাইরের কিছুই দেখা যায় না। অভিযোগ রয়েছে, ভেতরে অবৈধ লেনদেনের সুযোগ সৃষ্টি করতেই কাচগুলো প্যানাফ্লেক্সের তৈরি বিজ্ঞাপন দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়েছে।
ডিসি হেডকোয়ার্টার আনোয়ার হোসেন বলেন, জনগণের চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি না করে বুথ নির্মাণের পক্ষে তিনি। তার মতে, রোদ-বৃষ্টিতে রাস্তার মধ্যে পুলিশ সদস্যদের দায়িত্ব পালন করতে হয়। তাই একটু বিশ্রামের জন্য বুথ থাকলে সেটি দোষের কিছু নয়। বিজ্ঞাপন দিয়ে বুথগুলো ঘিরে রাখা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি ঠিক নয়, বুথগুলো স্বচ্ছ কাচ দিয়ে নির্মাণ করা দরকার এবং তাতে কোনো বিজ্ঞাপন দেয়া যাবে না। সে ব্যাপারে উদ্যোগ নেয়া হবে বলে জানান তিনি। আর অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগের ব্যাপারে তিনি বলেন, বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে অনুমতি নিয়ে এটি ব্যবহার করার কথা তারা ভাবছেন।
সরেজমিন রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক ঘুরে দেখা গেছে, শাহবাগে ফুলের দোকানের সামনে, বাংলা মোটর মোড়ের ইস্কাটন রোড এবং কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ সংযোগ পয়েন্টে ফুটপাতের ওপর রয়েছে পুলিশ বুথ। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক পয়েন্টের সড়কদ্বীপে এবং ফুটপাতে ডিএমপি দেড়শতাধিক পুলিশ বুথ স্থাপন করেছে। এদের মধ্যে সার্ক ফোয়ারা মোড়, বাংলা মোটর, টেকনিক্যাল মোড়, শাহবাগ, পান্থপথ, রাসেল স্কোয়ার, আড়ং ক্রসিং, গণভবন ক্রসিং, কাকরাইল তাবলিগ মসজিদ মোড়, নীলক্ষেত, গুলশান-১, গুলশান-২ এবং বনানী-কাকলী ক্রসিং উল্লেখযোগ্য। অধিকাংশ বুথেই অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়ে লাগানো হয়েছে বৈদ্যুতিক পাখা। শ্যামলী সিনেমা হল ভেঙে সেখানে নির্মাণ করা হচ্ছে বহুতল ভবন। পুরো ফুটপাত দখল করে টিন দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। আর তার মধ্যে উঁকি দিচ্ছে একটি পুলিশ বুথ। যদিও সেটি পুলিশ বুথ কিনা, তা দেখে বোঝার উপায় নেই। কারণ বুথের কাচের ওপর প্যানাফ্লেক্সের তৈরি মীর রিয়েল এস্টেটের বিজ্ঞাপন দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। কোথাও পুলিশ বুথ শব্দটিই লেখা নেই। রাজধানীর অনেক জায়গায় পত্রিকা, সংবাদ সংস্থা বা টিভি চ্যানেলের বিজ্ঞাপনও এসব বুথে শোভা পাচ্ছে। বিভিন্ন বুথের নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ডিএমপি সদর দপ্তর থেকে অনুমতি নিয়ে তারা বুথগুলো নির্মাণ করেছেন। শুধু নির্মাণ নয়, বিদ্যুৎ সংযোগ, চেয়ার-টেবিল, ফ্যান সবকিছুই তারা কিনে দিয়েছেন। আর পুলিশ সদস্যদের খেদমত করার জন্য একজন বেয়ারাও রাখতে হয় বুথগুলোতে। একটি বুথ নির্মাণ করতে অন্তত দুই লাখ টাকা খরচ করতে হয়। তাই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিয়ে তারা সেই টাকা তুলছেন।
 
পূর্ববর্তী সংবাদ
এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আপনার মতামত দিতে এখানে ক্লিক করুন
প্রথম পাতা -এর আরো সংবাদ
অনলাইন জরিপ
অনলাইন জরিপআজকের প্রশ্ননারীরাই বাংলাদেশের সমাজকে বদলে দিয়েছে_ নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের এই বক্তব্য আপনি সমর্থন করেন কি?হ্যাঁনাজরিপের ফলাফল
আজকের ভিউ
পুরোনো সংখ্যা
2010 The Jaijaidin