পূর্ববর্তী সংবাদ
মতামত :
¦
¦
বিএনপিতে জুজুর ভয়সন্দেহ ও আস্থাহীনতার জন্য আন্দোলনের কৌশল ঠিক করতে পারছে না দলটিযাযাদি রিপোর্ট মূলত অদৃশ্য 'জুজুর' ভয়েই সরকারবিরোধী আন্দোলন বেগবান করতে পারছে না প্রধান বিরোধী দল বিএনপি। সংঘাতময় রাজনৈতিক পরিস্থিতি সৃষ্টি করলে আবার না ওয়ান ইলেভেনের মতো অসাংবিধানিক সরকার দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষমতায় আসে, এমন আশঙ্কা আছে দলটিতে। অন্যদিকে গা বাঁচাতে দলের সুবিধাবাদীরা সরকারের সঙ্গে অাঁতাত করে আবার দলকে ভাঙনের মুখে ঠেলে দেয় কিনা তা নিয়েও সন্দেহ আছে। সব মিলিয়ে ভয়, সন্দেহ ও আস্থাভাজনের বিতর্কিত কর্মকা-ের কারণে আন্দোলনের কৌশল নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে বিএনপি প্রধানদের জন্য।
বিএনপির এক সিনিয়র নেতা জানান, সংঘাতময় রাজনৈতিক পরিস্থিতি সৃষ্টি করা খুব কঠিন কাজ নয়। এতে দলের তেমন কোনো লাভ হবে না, এমন বিবেচনায় এখনই কঠোর কর্মসূচি দেয়া হচ্ছে না। তার মতে, সরকার বিএনপিকে সবচেয়ে বেশি ভয় পাচ্ছে। বিএনপি ক্ষমতায় যাক তা কোনো অবস্থাতেই তারা চায় না। এজন্য সরকারের একটি অংশ চাচ্ছে, সংঘাতের রাজনীতি উস্কে দিতে। যাতে অসাংবিধানিক কোনো শক্তি ক্ষমতায় আসতে না পারে। এতে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় না থাকতে পেরে সুবিধাবাদী নেতানির্ভর বিএনপির অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাবে। পরবর্তীতে তারা রাজনৈতিক ফায়দা নিতে পারবে। সরকারি দলের এ মনোভাব অাঁচ করতে পেরে জ্বালাও পোড়াওনির্ভর সাংঘার্ষিক রাজনীতি এখনই শুরু করতে চাচ্ছে না বিএনপি।
সূত্র জানায়, বিএনপি নেতারা খালেদা জিয়াকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন যে, বড় কর্মসূচি দিলেই সহিংসতা বাড়বে। আর এ সুযোগে সাংবিধানিক সরকার ক্ষমতায় চলে আসবে। তারা বলেন, হেফাজতের কর্মসূচিতেই এমনভাবে অভিযান চালানো হয়েছে, বিকল্প কোনো শক্তি যাতে সুযোগ নিতে পারে। এখানে বিএনপির প্রতিরোধ গড়ে তুললেই আওয়ামী লীগের প্রতাশা পূরণ হতো। এ মিশনে সরকারের প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ার পরেই সংঘাতপূর্ণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি সৃষ্টি করতেই সভা-সমাবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। যাতে বিএনপি ও জামায়াত সেই পরিস্থিতি সৃষ্টি করে আওয়ামী লীগকে নিরাপদে বের হওয়ার সুযোগ করে দেয়।
এদিকে দলের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র বলছে, বিশেষ মহলকে নিয়ে যেমন ভয় আছে তেমনি নিজ দলের নেতাদের নিয়েও স্বস্তিতে নেই খালেদা জিয়া। আপাতত রাজনীতি করে লাভবান হওয়া সম্ভব হবে না বলে মনে করছেন বিএনপির অনেক সিনিয়র নেতা। বারবার জেল খাটতেও রাজি না তারা। এ জন্য অনেকে নতুন কোনো মোর্চার সঙ্গে যোগাযোগও করছেন। আবার অনেকে আপাদকালীন সময় পার করতে নিষ্ক্রিয় থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে এখনই চেয়ারপারসনকে সরাসরি কিছু বলে তার রোষানলে পড়তে চাচ্ছেন না তারা। আর প্রায় সব নেতাই নিজ নিজ ব্যক্তিগত স্বার্থ সংশ্লিষ্টতাকে প্রাধান্য দিয়ে আন্দোলনের কৌশল নির্ধারণের পরামর্শ দিচ্ছেন চেয়ারপারসনকে। পাশাপাশি একে অপরের বিরুদ্ধে সরকারের সঙ্গে অাঁতাতের অভিযোগ করেই ক্ষান্ত হচ্ছেন না; দালিলিক প্রমাণও উপস্থাপন করছেন। ফলে শীর্ষ নেতাদের এ ধরনের কর্মকা- ভাবিয়ে তুলেছে খালেদা জিয়াকে। এ অবস্থায় লন্ডনে অবস্থানরত পুত্র তারেক রহমান ছাড়া আপাতত কাউকে বিশ্বাস করতে পারছেন না তিনি। তবে তার পরামর্শ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতেও ভয় পাচ্ছেন। কারণ বিভিন্ন মাধ্যমে জানতে পেরেছেন এখনো হাওয়া ভবনের সেই বিতর্কিতদের সঙ্গ ত্যাগ করতে পারেননি তারেক রহমান। লন্ডনে তো বটেই; এর বাইরে যেখানেই যাচ্ছেন তারেক হাওয়া ভবনের সেই পঞ্চপা-ব তার সঙ্গে আঠার মতো লেগে আছে। সব মিলিয়ে অনেকটা নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছেন সবচেয়ে বেশি ক্ষমতায় থাকা দলের প্রধান খালেদা জিয়া।
সূত্র জানায়, তত্ত্বাবধায়ক সরকার চেয়ে সরকারকে দেয়া ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম নিয়েই মূলত বিপাকে পড়েছে বিএনপি। এরপর রাজধানীর শাপলা চত্বরে হেফাজতের সমাবেশে পুলিশের হামলা থেকে 'ধীরে চলো নীতি'র অনুসরণ করছে দলটি। বেঁধে দেয়া সময়ের মধ্যে সরকার দাবি তো মানেই নি, উল্টো হুমকি দিয়ে রেখেছে। ভেস্তে গেছে সংলাপের আশাও। কিন্তু এর জবাবে বিএনপি কোনো আন্দোলন দাঁড় করাতে পারেনি। বরং আরো চুপসে গেছে। এমনিতে দলের সিদ্ধান্ত নিয়ে তৃণমূলে তীব্র অসন্তোষ বিরাজ করছে। এর সঙ্গে যোগ হয় বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের দ্বন্দ্ব আর পরস্পরের প্রতি সন্দেহ-অবিশ্বাস।
দলীয় সূত্রে জানা যায়, সন্দেহ-অবিশ্বাসের নেপথ্যে রয়েছে আরো কিছু ঘটনা। সরকারের সঙ্গে সমঝোতা করে চলা, নেতাদের আত্মগোপন কৌশলে প্ররোচিত করা এবং মামলা পরিচালনার ধরনসহ সামপ্রতিক নানা কর্মকা- নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়েন দলের কয়েক জন স্থায়ী কমিটির সদস্য ও মধ্যসারির কয়েক জন নেতা। তাদের এই প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা নিয়ে দলের নানামহলে প্রকাশ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে।
নাম না বলার শর্তে এক স্থায়ী কমিটির সদস্য ওয়ান ইলেভেনের পরিস্থিতি তুলে ধরে জানান, নতুন করে নেতারা বিভক্ত হলে তা সামাল দেয়ার উপায় থাকবে না। তখন সরকার নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করার দোহাই দিয়ে নিজেদের অধীনে আগাম নির্বাচন আয়োজন করে বিএনপিকে সে নির্বাচনে অংশ নিতে বাধ্য করতে পারে। যে নির্বাচনে অংশ নিতে পারে দলের বড় একটি অংশ। এমনকি সরকার খালেদা জিয়াসহ জিয়াপরিবারের বিরুদ্ধে মামলার গেরো টেনে পুরো জাতীয়তাবাদী রাজনীতিকেই একটি অস্তিত্বের সঙ্কটে ফেলে দেবে।
তৃণমূল নেতাকর্মীরা মনে করেন, সন্দেহভাজন নেতারা মাঝেমধ্যে সরকারি দলের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। সরকারও তাদের অন্য নেতাদের মতো হয়রানি ও ধরপাকড় না করে নিরাপদে রেখেছে। বিএনপির নেতাকর্মীরা যখনই জেল-জুলুমের শিকার হচ্ছেন, তখনই ওই নেতারা অতিমাত্রায় সক্রিয় হচ্ছেন।
বেহাল বিএনপির সর্বশেষ চিত্র ফুটে উঠেছে গত শনিবারের স্থায়ী কমিটির রাতের বৈঠকে। সেখানে চেয়ারপারসনের উপস্থিতিতে সিনিয়র নেতারা তর্কে জড়িয়েছেন। একে অন্যকে সরকারের হয়ে কাজ করছেন বলতেও ছাড়েননি।
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, চেয়ারপারসনের গুলশান কার্যালয়ে বৈঠক চলাকালে হঠাৎ করেই র‌্যাব উপস্থিত হলে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন স্থায়ী কমিটির নেতারা। তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন, এখনই হয়তো দলীয় চেয়ারপারসনকে 'গ্রেপ্তার' করা হবে। আর এই পরিস্থিতির জন্য খালেদা জিয়ার সামনেই সিনিয়র নেতারা একে অন্যকে দোষারোপ করতে থাকেন। কেউ কেউ আগ বাড়িয়ে সরকারের সঙ্গে 'অমুক অমুক' নেতা লিয়াজোঁ করছেন বলে অভিযোগের তীর ছুড়ে দেন। শুরু হয় বাক-বিত-া।
পরে স্বয়ং খালেদা জিয়ার হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত হয়। তিনি রীতিমতো নেতাদের প্রতি হুশিয়ারি দিতে বাধ্য হন। যার ফলস্বরূপ কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই শেষ হয় সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী ফোরামের এই বৈঠক।
গুলশান কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, শনিবার রাতে দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে দুজন সিনিয়র নেতা দলের চেয়ারপারসনের সামনেই 'বাকযুদ্ধে' লিপ্ত হন। আন্দোলনের পরবর্তী কর্মসূচি ও তা বাস্তবায়নের পরিকল্পনা একের পর এক ফাঁস হয়ে যাওয়ার প্রসঙ্গ নিয়ে ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের মধ্যে প্রথমে কথা কাটাকাটি হয়। পরে তা আরো ব্যাপকতা পায়। দলের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত ছাড়া আগ বাড়িয়ে সংসদে যোগদানের ব্যাপারে গণমাধ্যমে কথা বলায় ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেন খন্দকার মোশাররফ।
একপর্যায়ে তিনি ব্যারিস্টার মওদুদকে ইঙ্গিত করে দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার উদ্দেশে বলেন, ম্যাডাম দলের শীর্ষ মহলে সরকারের 'গুপ্তচর' ঢুকে পড়েছে। তাই কোনো কিছুই গোপন থাকছে না। তারা যা সিদ্ধান্ত নেন, তা ফাঁস হয়ে যায়।
খন্দকার মোশাররফের এমন মন্তব্যের পর দলের আরেক স্থায়ী কমিটির সদস্য তাতে মাথা নাড়িয়ে সমর্থন দেন। সহকর্মীদের এমন আচরণে সঙ্গে সঙ্গে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন সাবেক আইনমন্ত্রী।
অবস্থা বেগতিক দেখে খালেদা জিয়া নতুন কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়া বৈঠক মুলতবি করেন এবং মোশাররফ ও মওদুদকে ডেকে সতর্ক করে দেন। তিনি তাদের হুশিয়ারি দিয়ে বলেন, যা হয়েছে, এখানেই যেন সীমাবদ্ধ থাকে। ফের এসব হলে বরদাশত করা হবে না।
তবে এ বিষয়ে খন্দকার মোশাররফ হোসেন এবং ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ দুজনের কেউই মুখ খুলতে রাজি হননি। একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তারা কোনো মন্তব্য করেননি।
কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে যে এ ধরনের দূরত্ব আছে, তা এই ঘটনাকেই প্রথম বলা যাবে না। এই কদিন আগেও ঢাকা মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক সাদেক হোসেন খোকার বিরুদ্ধে দলের মধ্যে অভিযোগ ওঠে, তিনি কারাবন্দি অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের পাশে গোয়েন্দাগিরি করান, যাতে কে কে তার সঙ্গে যোগাযোগ করছেন তা জানা যায়।
দলের স্থায়ী কমিটির এক সদস্য জানান, এখন বড় কর্মসূচি দেয়া হলে নৈরাজ্যের ঘটনা দেখিয়ে সরকার নতুন মামলা দেবে। সেই সঙ্গে পুরনো মামলা নিয়ে বিরোধী নেতাদের রাজনৈতিকভাবে কব্জায় রয়েছে। তাই পরিস্থিতি বিবেচনা করেই কর্মসূচি দিতে হবে। তিনি দলের কিছু নেতার সন্দেহজনক ভূমিকার বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকার নানা কৌশল অবলম্বন করছে। কেন্দ্রীয় নেতাদের অনেকের গলায় গলায় মামলা। মামলার ভয় দেখিয়ে তাদের মানসিকভাবে দুর্বল করা হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও তরিকুল ইসলাম বলেন, দল ভাঙার চেষ্টা আছে বলে জানা নেই। তবে ষড়যন্ত্র করা হলে তা সফল হবে না। আরেক নেতা লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান বলেন, এমন কথা ভিত্তিহীন। বরং দল আরো সংঘটিত হচ্ছে। এমকে আনোয়ার বলেন, এই সরকার ফখরুদ্দিন-মইনুদ্দিনের কাছ থেকে কিছু ঐতিহ্য পেয়েছে। তা হলো দল ভাঙা। বিএনপিকে ভাঙার প্রক্রিয়া চলছে, এর সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য তিনি দিতে পারবেন না।
 
( লেখাটি পড়া হয়েছে ২৮৪ বার )
পূর্ববর্তী সংবাদ
এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আপনার মতামত দিতে এখানে ক্লিক করুন
প্রথম পাতা -এর আরো সংবাদ
অনলাইন জরিপ
অনলাইন জরিপআজকের প্রশ্নসংলাপে তৃতীয় পক্ষে মধ্যস্থতার দরকার নেই_ মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান ডবিস্নউ মজিনার এই বক্তব্যের সঙ্গে আপনি কি একমত?হ্যাঁনাজরিপের ফলাফল
আজকের ভিউ
পুরোনো সংখ্যা
2010 The Jaijaidin